থাকার জায়গা ছিল না, মুম্বাইয়ে মাঠকর্মীদের তাঁবুতে রাত কাটাতো ছেলেটা। নিজের খরচ চালানোর জন্যে খেলার পাশাপাশি পানিপুরি বিক্রি করতো মাঠে। সেই যশস্বী জয়সওয়ালকে আইপিএলে আড়াই কোটি রূপিতে দলে ভিড়িয়েছে রাজস্থান রয়্যালস, পাকিস্তানের বিপক্ষে গতকাল দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরী হাঁকিয়ে ভারতকে ফাইনালে তুলেছেন যিনি...

তার জীবনের গল্পটা নিয়ে দুর্দান্ত একটা সিনেমা বানিয়ে ফেলা যাবে। হাজারো প্রতিকূলতাকে তিনি জয় করেছেন, দারিদ্র‍্যতাকে হারিয়ে নিজের স্বপ্নকে পূরণের পথে হেঁটেছেন। মুম্বাইয়ে থাকার কোন জায়গা ছিল না, মাঠকর্মীদের তাঁবুতে যে ছেলেটা রাত কাটাতেন, ক'টা টাকার জন্যে যিনি মাঠের পাশে পানিপুরি বিক্রি করতেন, তিনিই গতকাল পাকিস্তানের বিপক্ষে সেঞ্চুরী হাঁকিয়ে ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দলটাকে ফাইনালে তুলেছেন, এবারের আসরে সেরা খেলোয়াড় হবার দৌড়েও টিকে আছেন তিনি। এবারের আইপিএলে তরুণ এই ক্রিকেট সেনসেশনকে প্রায় আড়াই কোটি রূপিতে কিনেছে রাজস্থান রয়্যালস! নাম তার যশস্বী জয়সওয়াল, উত্তরপ্রদেশে জন্ম নেয়া এই কিশোরকে ধরা হচ্ছে ভারতীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যত তারকা হিসেবে।

ভাদোহি নামের শহরটাকে ভারতের মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না সহজে, গুগল ম্যাপে সার্চ দিলে অবশ্য পাওয়া যাবে। দিল্লি থেকে কয়েকশো মাইল দূরের এই জায়গাটা পড়েছে উত্তরপ্রদেশের সীমানায়। যশস্বী জয়সওয়ালের জন্ম সেখানেই। পরিবারের অবস্থা 'নুন আনতে পান্তা ফুরোয়'- এর চেয়েও খারাপ। বাবার ছোট্ট একটা দোকান ছিল, সেখানে বেচা-বিক্রিও ভালো নয়। পেটে-ভাতে করে কোনমতে দিন কেটে যায়, কেউ রোগেশোকে পড়লে বাড়তি খরচ হয়, সেই মাসের শেষ ক'টা দিন আধপেটা করা লাগে।

সেই পরিবারের ছেলে হয়ে যশস্বী জয়সওয়াল যখন ক্রিকেটার হতে চাইলেন, ব্যাপারটা আকাশ কুসুম কল্পনার মতোই ছিল সবার কাছে। ক্রিকেটার হওয়া তো মুখের কথা নয়। ভালো একটা ব্যাটের যা দাম, সেই টাকা দিয়ে যশস্বীদের পরিবারের এক মাসের সব খরচ চলে যায়। কিন্ত দরিদ্র হলেও, যশস্বীর বাবা বুঝতে পেরেছিলেন, ছেলের মাথায় ক্রিকেটের যে পোকাটা ঢুকেছে, সেটা সহজে বের হবে না। একটা জুয়াই খেলে বসলেন ভদ্রলোক। দোকান বিক্রি করে ছেলেকে নিয়ে চললেন মুম্বাইয়ে, যশস্বীর চোখে তখন ক্রিকেটার হবার স্বপ্ন।

তবে কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। দারিদ্র‍্যের কষাঘাতে জর্জরিত হতে হয়েছে প্রতিনিয়ত। বাবা তো তাকে মুম্বাইয়ের ক্রিকেট ক্লাবে ভর্তি করেই চলে গেলেন, কোলাবাদেবীর একটা ডেইরি ফার্মে দিনঠিকা কাজের চুক্তি হয়েছিল। বিনিময়ে তারা থাকতে দেবে। কিন্ত সারাদিন মাঠে থাকায় তাদের কাজে সাহায্য করতে পারতেন না ঠিকঠাক, এজন্যে তারা চলে যেতে বললো যশস্বীকে। এখন উপায়?

বাড়িতে এই খবর জানানোর পরে মুম্বাইয়ে থাকা তার এক খালুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হলো। সেই খালুর বাসায় থাকলেন মাস খানেক। সেখানেও ঘিঞ্জি একটা অবস্থা, বাড়তি একটা মানুষ থাকার মতো জায়গা কোথায়! তাই খালু তাকে একটা বুদ্ধি দিলেন, মুম্বাইয়ের যে আজাদ ময়দানে প্র‍্যাকটিস করতেন যশস্বী, সেখানকার মাঠকর্মীদের থাকার জন্যে তাঁবুর ব্যবস্থা ছিল। যশস্বীর ঠিকানা হয়ে উঠলো সেই তাঁবু।

যশস্বী জয়সওয়াল


একদিন দুইদিন নয়, টানা তিনটা বছর সেখানে কাটিয়েছেন তিনি। তাঁবুর ভেতর বিদ্যুতের ব্যবস্থা ছিল না। ভ্যাপসা গরমের রাতে তাঁবু থেকে বেরিয়ে খোলা আকাশের নিচে শুয়েছেন, শীতের রাতে মাঠ ঢাকার তেরপাল গায়ের ওপরে জড়িয়েও ঠান্ডায় ঠকঠক করে কেঁপেছেন। সবকিছুই করেছেন ক্রিকেটকে ভালোবেসে, ক্রিকেটার হবার জন্যে।

রাতে তো সংগ্রাম চলতোই, দিনে সঙ্গী ছিল ক্রিকেট। নাওয়া-খাওয়া ভুলে এটার পেছনেই পড়ে থাকতেন। টেন্ডুলকার-কোহলিদের উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করার কাজটা সেই আজাদ ময়দানেই শুরু করে দিয়েছিলেন যশস্বী। কিন্ত যশস্বীর বাকী সতীর্থদের সবাই মোটামুটি অবস্থাসম্পন্ন পরিবার থেকে আসা, অন্তত ভাতের চিন্তা কাউকে করতে হতো না। যশস্বীর তো সেই বিলাসিতা নেই। বাড়ি থেকে পাঁচশো রুপি পাঠানো হতো, সেটা দিয়ে মুম্বাইয়ের বুকে এক সপ্তাহও টিকে থাকা যায় না।

আর তাই পেটের তাগিদে আজাদ ময়দানের পাশেই পানিপুরি বিক্রি করতে শুরু করলেন যশস্বী। একটু আগে যে আঙ্কেলের কথা বলা হলো, তিনিও এই কাজই করতেন। তিনিই যশস্বীকে শিখিয়েছেন কীভাবে পানিপুরি বানাতে হয়। সারাদিন প্র‍্যাকটিস করে, খেলা শেষ করেই যশস্বী সন্ধ্যা থেকে পানিপুরির ডাব্বা নিয়ে বসতেন। এমনও হয়েছে, তার সতীর্থদের কেউই হয়তো তার কাছে পানিপুরি কিনতে এসেছে। লজ্জায় কুঁকড়ে যেতেন যশস্বী, কিন্ত কাজটা ছাড়তে পারেননি তিনি, পেটের দায় বলে কথা! কখনও নিজেই মাঠকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন, আবার কখনও বা স্কোরারের রূপে আবির্ভূত হয়েছেন- সবটাই টাকার জন্যে।

এমন সময়ে যশস্বীর জীবনের গল্পে নতুন একটা চরিত্রের আগমন ঘটলো, নাম তার জ্বালা সিং। উত্তরপ্রদেশে জন্ম নেয়া এই ভদ্রলোকও একসময় ক্রিকেটার হবার বাসনা নিয়ে মুম্বাইতে এসেছিলেন, কিন্ত পূরণ হয়নি তার স্বপ্ন। আজাদ ময়দানের ভেজা উইকেটে ফার্স্ট ডিভিশনের বোলারদের বিপক্ষে তেরো বছরের যশস্বীর ব্যাটিং দেখে মুগ্ধ হলেন জ্বালা, ডেকে নিলেন তাকে। শুনলেন তার জীবনের গল্প, হলেন আপ্লুত। মাঠ কর্মীদের তাঁবু ছেড়ে যশস্বীর ঠিকানা হয়ে গেল জ্বালা সিংয়ের তিন কামরার ফ্ল্যাট।

পাকিস্তানের বিপক্ষে সেঞ্চুরী হাঁকিয়ে ভারতকে টুর্নামেন্টের ফাইনালে তুলেছেন যশস্বী

এরপরের গল্পটা এগিয়ে যাওয়ার। যশস্বীর জীবনে মেন্টর হিসেবে, কোচ হিসেবে জ্বালা সিংয়ের অবদান অপরিসীম। নিজের জীবনের অপূর্ণতাকে যশস্বীর মাধ্যমেই পূরণ করার চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন জ্বালা সিং। হীরে চিনে নিতে ভুল হয়নি তার। স্কুল ক্রিকেটে দুর্দান্ত পারফর্ম করে নজর কাড়লেন যশস্বী, ডাক এলো অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে খেলার। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অভিষেক হলো ভারতের জার্সি গায়ে, তারপর অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলতে এলেন বাংলাদেশে। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান এলো তার ব্যাট থেকে, হলেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ও!

তারপরে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। রঞ্জিতে অভিষেক হলো, ক'দিন আগে বিজয় হাজারে ট্রফিতে ডাবল সেঞ্চুরি করে আলোড়ন তুললেন, সেটা মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আইপিএলের খবরটা এলো। তরুণ এই প্রতিভাকে নজরে রেখেছিল বেশ কয়েকটা ফ্র‍্যাঞ্চাইজিই। শেষমেশ কলকাতার নিলামে ২.৪০ কোটি রুপির বিনিময়ে যশস্বীকে কিনে নিল রাজস্থান রয়্যালস। তার বেস প্রাইস ছিল ২০ লক্ষ টাকা। খবরটা শুনে বিশ্বাস হয়নি যশস্বীর বাবার, যিনি ছেলেকে ক্রিকেটার বানানোর জন্যে দোকান বিক্রি করে দিনমজুরের কাজ করেছেন, ছেলের সামর্থ্যের ওপর যিনি ভরসা রেখেছিলেন।

যশস্বীর এখন কেবল এগিয়ে যাওয়ার পালা, নতুন ইতিহাস নিশ্চয়ই রচিত হবে তার হাতে। কিন্ত যে ইতিহাসের জন্ম তিনি ইতিমধ্যেই দিয়ে ফেলেছেন, সেটা তো অনুপ্রেরণা হতে পারে যে কারো জন্যেই। পাওলো কোয়েলহোর সেই লাইনটা- মন থেকে কিছু চাইলে পুরো দুনিয়া সেটা তোমাকে পাইয়ে দেয়ার চেষ্টায় রত হয়'- এর স্বার্থক উদাহরণ তো যশস্বী জয়সওয়ালই!

ফুটনোট- এই লেখাটা অকালপ্রয়াত সাংবাদিক দীপায়ন অর্ণবকে উৎসর্গ করা হলো। বিজয় হাজারে ট্রফিতে যশস্বী যখন ডাবল সেঞ্চুরী হাঁকিয়েছিলেন, তখন তাকে নিয়ে বাংলা ভাষায় সেরা ট্রিবিউটটা দিয়েছিলেন অর্ণব। আজ অর্ণবদা নেই, স্বর্গে ডন ব্র‍্যাডম্যান আর ফিলিপ হিউজের পাশে বসে তিনি নিশ্চয়ই যশস্বীর সেঞ্চুরীটা দেখেছেন, যশস্বীর পরিশ্রমের স্বীকৃতি প্রাপ্তিটা অর্ণবদাকে আনন্দিত করবে নিশ্চয়ই... 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা