আজকের মতো পাওয়ার প্লে তখন ছিল না, বাউন্ডারির দৈর্ঘ্যও ছিল এখনকার চেয়ে অনেক বড়। তবুও চার-ছক্কা হাঁকানো যেনো খুবই সহজ ছিল ভিভ রিচার্ডসের জন্য। বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে তিনি তিনি নাচিয়ে ছাড়তেন প্রতিপক্ষ বোলারদের।

বাবা ম্যালকম রিচার্ডস ছিলেন একজন আগ্রাসী পেস বোলার। বাবার সেই আগ্রাসন ছিল ছেলের মধ্যেও। তবে সেটা বল হাতে নয়, ছেলে ভিভ রিচার্ডসের আগ্রাসন ছিল ব্যাট হাতে। আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের সূচনাটাই হয়েছিল তার হাত ধরে। ক্রিকেট বলটা যেনো তার কাছে শুধুই পেটানোর বস্তু, আর প্রতিপক্ষ বোলাররা যেনো তার জাতশত্রু! আক্রমণাত্মক ব্যাটিংটাকে তিনি এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন যে মারকুটে, বিধ্বংসী শব্দগুলো যেনো সবচেয়ে বেশি তার সাথেই মানানসই। 

কিছু ব্যতিক্রম গুণাবলীর জন্য ভিভ রিচার্ডস বেশি আলোচিত হতেন। মাঠে নিয়ন্ত্রিত আগ্রাসন দ্বারা তিনি প্রতিপক্ষকে শাসন করতেন। ক্রিকেটের অন্যতম আইকোনিক দৃশ্যগুলোর একটি হচ্ছে ভিভ রিচার্ডসের উইকেটে আসার দৃশ্য। আউট হয়ে যাওয়া ব্যাটসম্যান বাউন্ডারি লাইন পার হয়ে গেলেও যেনো আসার খবর থাকতো না তার। ইচ্ছাকৃতভাবে দেরী করে তিনি উইকেটে আসতেন। আসার সময় কখনোই মাথায় হেলম্যাট পড়তেন না। তার মতে, হেলম্যাট পড়লে বোলারকে সম্মান দেওয়া হয়।

চুইংগাম চিবোতে চিবোতে ব্যাট হাতে দাঁড়াতেন উইকেটে। ব্যাটিংয়ে করার সময় এমন ভাব নিতেন যেনো প্রতিপক্ষ ইতিমধ্যেই ব্যাকফুটে চলে গেছে। ভিভ বরাবরই লম্বা সময় ধরে গার্ড নিতেন, ব্যাটের মৃদু আঘাতে পিচের ওপর দাগ করার সময়টায় তার খেয়াল থাকতো একটা দিকেই- বোলারকে অপেক্ষা করানো, প্রতিপক্ষকে তাতিয়ে দেয়া। মাঠে নামলে রোমান কোলাসিয়ামে নামা বিজয়ী গ্ল্যাডিয়েটরের মতোই থাকতো তার আচরণ, নিজের বীরত্বকে জাহির করতে কখনোই পিছপা হতেন না তিনি। দল যতই বিপর্যয়ে থাকুক না কেনো তাকে দেখে কোনোভাবেই মনে হতো না তিনি চাপে আছেন।

ভিভ রিচার্ডসকে স্লেজিং করা মানে তার আগ্রাসনকে আরো তাতিয়ে দেওয়া। একবার এই স্লেজিং নিয়ে তিনি ঘটিয়েছিলেন অবাক করা এক ঘটনা। কাউন্টির কোনো এক ম্যাচে গ্ল্যামারগানের বোলার গ্রেগ থমাস তাকে কয়েকটি বলে পরাস্ত করেছিলেন। থমাসকে শট খেলতে গিয়ে কয়েকটি বল ব্যাটে লাগাতে পারেননি ভিভ। এই বিধ্বংসী ব্যাটসম্যানকে পরাস্ত করার অহমিকায় থমাস নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। একটু এগিয়ে গিয়ে ভিভকে বললেন, "তোমার জ্ঞাতার্থে, এটি একটি লাল বল। এটি গোলাকার এবং এর ওজন সাড়ে পাঁচ আউন্স।" এর পরের বলেই তাকে ছক্কা হাঁকিয়ে পাশের তাফ নদীতে ফেললেন ভিভ। তারপর থমাসকে গিয়ে বললেন, "তুমি যেহেতু বলটা কি রকম তা চেনো, তাই কোনো বলবয়কে ছাড়া এখনই বলটি খুঁজে আনো।" প্রথম স্লিপে দাঁড়ানো হুগ মরিস তখন নিজ দলের বোলারকে গিয়ে বললো, 'এটা কি করলে তুমি? কেন ভিভকে ক্ষেপালে?' 

ভিভকে ক্ষেপানোটা কতটা আত্মঘাতী, পরের ৭০ মিনিট গ্ল্যামারগানের বোলারা সেটা ভালভাবেই টের পেয়েছিল। এই সময়ে তাদের উপর রীতিমতো তান্ডব চালিয়েছেন এই ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তী। যদিও দুর্ভাগ্যজনকভাবে রান আউট হয়ে ১৩৬ রানে থেমেছিল তার ওই ইনিংস। 

একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ২০১১ সালে সর্বপ্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন শচীন টেন্ডুলকার। অথচ তার ২৭ বছর আগেই ওয়ানডেতে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির দেখা পেয়ে যেতেন ভিভ রিচার্ডস। সেদিন ওল্ড ট্রাফোর্ডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৭০ বলে ১৮৯ রানে অপরাজিত ছিলেন তিনি। ২১ চার এবং ৫ ছয়ে সাজানো ছিল তার সেই ইনিংস। তার সেই ইনিংসটিকেই গত শতাব্দীর সেরা ওডিআই ইনিংস ধরা হয়। 

১৯৭৪ সালে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল ভিভের। ওয়ানডেতে অভিষেক হয়েছিল তার এক বছর পর। আজকের মতো পাওয়ার প্লে তখন ছিল না। বাউন্ডারির দৈর্ঘ্যও ছিল আরো বড়। তবুও তার স্ট্রাইকরেট ছিল ঈর্শনীয়। টেস্টে তার স্ট্রাইকরেট ছিল ৮৬.০৭। যা আজকের দিনেও কল্পনা করা যায় না। আর ওয়ানডেতে ৯০.২। পরিসংখ্যান বলছে, ১২১টি টেস্ট খেলে তিনি ৮৫৫০ রান করেছেন। আর ১৮৭টি ওয়ানডে খেলে তিনি করেছেন ৬৭২১ রান। কিন্তু তিনি এমন একজন ক্রিকেটার যাকে পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। 

২০০২ সালে ক্রিকেটের বাইবেল খ্যাত 'উইজডেন' তাকে সর্বকালের সেরা ওডিআই ক্রিকেটার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। অবশ্য তার ৩ বছর আগে নিজ দেশ এন্টিগাতে 'নাইট' উপাধীতে ভূষিত হয়েছিলেন তিনি। এছাড়া, ক্রিকেটে অবদানের জন্য ব্রিটিশ OBE বা of the Order of the British Empire উপাধি পেয়েছিলেন এই কিংবদন্তী ব্যাটসম্যান। ২০০৭ সালে তার নামে 'স্যার ভিভ রিচার্ডস স্টেডিয়াম' উদ্বোধন করা হয় এন্টিগাতে।

ক্রিকেটকে বলা হয়, রাজকীয় খেলা। ভিভ রিচার্ডস হচ্ছেন শিকারের খোঁজে উন্মাদ এক রাজা। তিনি ব্যাটিংয়ে নামলে প্রতিপক্ষের ফিল্ডাররা সব বাউন্ডারিতে থাকতেন। আজকের মতো ফিল্ডিং রেস্ট্রিকশন তখন ছিল না। তবুও প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণকে কি দারুণভাবেই না ধ্বংস করে দিতেন তিনি। নিজের এমন আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের জন্যই তিনি জায়গা করে নিয়েছেন ক্রিকেট ইতিহাসের সেরাদের কাতারে। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা