ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে এত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে, এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য কি একজন সম্ভাবনাময় ফিনিশার হিসেবে সোহানকে সুযোগ দেওয়া যেতো না?

আমাদের দেশের ক্রিকেটারদের ফিনিশিংয়ে খেলতে বড্ড আপত্তি। জাতীয় দলে যাদেরকে ফিনিশার হিসেবে চিন্তা করা হয়, ঘরোয়া লীগে তারাই আবার টপ অর্ডার কিংবা টপ মিডেল অর্ডারে খেলতে পছন্দ করেন। এমনকি মিডিয়ার সামনে এলে তাদের অনেককেই নিজের ব্যাটিং অর্ডার এগিয়ে আনার জন্য আকুতি-মিনতি করতে দেখা যায়। সবাই যেন ফিনিশিংয়ের দায়িত্ব নিতে অনীহায় ভুগেন। 

কিন্তু একজন ক্রিকেটার আছেন যিনি নিজেকে ভাল ফিনিশার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রচেষ্টা করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ জাতীয় দলের যে তেমনই একজন খুবই প্রয়োজন। দলের প্রয়োজনের কথা চিন্তা করে তিনি ঘরোয়া লীগেও লোয়ার মিডেল অর্ডারে ব্যাটিং করে থাকেন নিয়মিত। তিনি হয়তো ওপেনিংয়ে নেমে একের পর এক সেঞ্চুরি করে নিয়মিত সংবাদের শিরোনাম হতে পারেন না, কিন্তু শেষ দিকে নেমে বোলারদের সঙ্গী করে ইনিংস এগিয়ে নেওয়ার কাজটা ভালভাবেই করতে পারেন। ওয়ানডে ফরম্যাটে হওয়া ঢাকা প্রিমিয়ার লীগে গত ৩ মৌসুম ধরে ধারাবাহিকভাবে ৫০০+ রান করা একমাত্র মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান তিনি। 

যার কথা বলছিলাম, তিনি হলেন বাংলাদেশের টেকনিক্যালি সবচেয়ে সেরা উইকেটরক্ষক নুরুল হাসান সোহান। জাতীয় দলের হয়ে ৩ টেস্ট, ২ ওয়ানডে এবং ৯ টি-২০ খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। নিজের সর্বশেষ ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছেন ৩ বছর আগে স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। সেই ম্যাচটিতে ১০১ রানে প্রথম উইকেট হারানো বাংলাদেশ দলের ১৭০ রানেই ছয় উইকেটের পতন হয়েছিল। কিউই পেসারদের বোলিং তোপে দল যখন বিধ্বস্ত তখন মাঠে এসেছিলেন তিনি। মিডল অর্ডারের ব্যর্থতায় ধসে পড়া বাংলাদেশের ইনিংসকে কিছুটা মেরামত করেছিলেন। বোলারদের সঙ্গী করে দলের ইনিংসকে টেনে নিয়েছিলেন ২৩৭ রান পর্যন্ত।

ম্যাট হেনরির বলে আউট হওয়ার আগে সেই ইনিংসে তার ব্যক্তিগত সংগ্রহের খাতায় জমা হয়েছিল ৩৯ বলে ৪৪ রান। কিন্তু পরের সিরিজেই এমন সম্ভাবনাময় ফিনিশারকে আর সুযোগ দেয়নি বাংলাদেশ। অথচ নিউজিল্যান্ডের সাথে বাংলাদেশের পরবর্তী ওয়ানডে সিরিজে লিটন দাস টানা ৩ ম্যাচে ধারাবাহিকভাবে ১ রান করেও বাদ পড়েননি। বিসিবির এ কেমন দ্বিমুখী নীতি?

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে নিজের সর্বশেষ টেস্ট সিরিজ খেলেছিলেন সোহান। সেই সিরিজে ভরাডুবি হয়েছিল টাইগারদের। এমনকি ৪১ রানে অলআউট হওয়ার লজ্জায়ও পড়তে হয়েছিল তাদের। ২ ম্যাচ টেস্ট সিরিজের দুটিতেই ইনিংস ব্যবধানে হারতে হয়েছিল লাল সবুজের প্রতিনিধিদের। ঐ সিরিজে মাত্র দুটি ফিফটি পেয়েছিল বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। যার একটি করেছিলেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান আর অন্যটি এসেছিল নুরুল হাসান সোহানের ব্যাট থেকে। সেই ফিফটি করতে গিয়ে একটি রেকর্ডও গড়েছিলেন সোহান। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে দ্রুততম টেস্ট ফিফটির রেকর্ডটা এখন তার দখলে। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, এর পরের সিরিজে আর দলে ডাক পাননি তিনি। 

২০১৮ সালের জুলাইতে সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা সোহান জাতীয় দলে ফেরার জন্য নিজেকে আরো পরিণত করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। নিজের স্কিলের উন্নতির জন্য রেখেছেন ব্যক্তিগত ট্রেইনার।সদ্য সমাপ্ত বিপিএলেও তার উন্নতির কিছুটা ছাপ লক্ষণীয় ছিল। চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের হয়ে ১১ ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে তিনি সংগ্রহ করেছিলেন ১৬২ রান। বেশিরভাগ সময়ে তাকে ব্যাটিংয়ে নামতে হয়েছে এমন সময় যখন দল একেবারে জয়ের দ্বারপ্রান্তে। এ কারণেই কয়েকটি ম্যাচে ৫ কিংবা ৬ রানের মধ্যেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে তাকে।

১১ ইনিংসের ৬টিতেই অপরাজিত ছিলেন তিনি। তাই তার গড়টাও উল্লেখ করার মতো। এই বিপিএলে তার ব্যাটিং গড় ছিল ৩২.৪। নিয়মিত ঝড়ো ব্যাটিংয়ের সুযোগ না আসলেও তার স্ট্রাইক রেটটা মোটেও খারাপ নয়, অন্তত বাংলাদেশি হিসেবে তো নয়ই। বঙ্গবন্ধুর নামে হওয়া বিপিএলের এই বিশেষ আসরে তার স্ট্রাইকরেট ছিল ১৩৩.৮৮। টুর্নামেন্টে তার ২টি ছয় একশো মিটার পেরিয়েছিল। তারমধ্যে ১১০ মিটার ছয়টি ছিল দূরত্বের দিক থেকে টুর্নামেন্টের তৃতীয় সর্বোচ্চ। 

বিপিএলের এই আসরে চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের দৃঢ়তায় নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ সেভাবে আসেনি সোহানের সামনে। তবুও তার রয়েছে একটি ম্যাচ জেতানো ইনিংস। তার পারফরম্যান্সটা হয়তো তেমন আহামরি মনে হচ্ছেনা কিন্তু এই বিপিএলে ৬ নম্বর পজিশনে বাংলাদেশিদের মধ্যে তিনিই সেরা পারফর্মার। 

প্রায় ৮ জন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান নিয়ে পাকিস্তানে খেলতে গেল বাংলাদেশ। যেখানে মাহমুদউল্লাহ ছাড়া নেই আর কোন মিডেল অর্ডার ব্যাটসম্যান। তাই পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সবাইকে নিজেদের স্বাভাবিক পজিশনের চেয়ে আলাদা পজিশনে খেলাচ্ছে টিম ম্যানেজমেন্ট। প্রশ্ন হলো, এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য কি একজন সম্ভাবনাময় ফিনিশার হিসেবে সোহানকে সুযোগ দেওয়া যেতো না?


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা