বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের প্রতিটি ম্যাচেই বহুবার ক্যামেরা চলে যাচ্ছিল রিচার্ড স্টনিয়ার দিকে। ডাগআউট থেকে ক্রমাগত উৎসাহ যুগিয়ে যাচ্ছিলেন মানুষটা। এত চনমনে, এত আবেগের বহিঃপ্রকাশ- কী কারণে রীতিমত পাগলামো করছিলেন তিনি?

ইমন আউট হয়ে ফিরে গেছেন কিছুক্ষণ আগে, জয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের দূরত্বটা তখনও ১৬ রানের। হাতে ওভার প্রচুর, কিন্ত উইকেট পড়লেই বিপদ! ৪০তম ওভারের খেলা শেষ হবার পরে সীমানা দড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে উইকেটে থাকা আকবর আর রাকিবুলের উদ্দেশ্যে এক ভদ্রলোক ভাঙা বাংলায় চিৎকার করে উঠলেন- 'শেষ কোড়ে আশো!' সাদা চামড়ার এই ভদ্রলোককে বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তরা চিনে থাকবেন, অন্তত এই অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো খেয়াল করলেও তাকে চোখে পড়ার কথা।

সারাক্ষণই তিনি কিছু না কিছু করছেন, লাফাচ্ছেন, ছুটছেন, বাউন্ডারি রোপের বাইরে দাঁড়িয়ে দলকে উজ্জীবিত করছেন, শিষ্যদের বুকে গুঁজে দিচ্ছেন জয়ের মন্ত্রণা। নাম তার রিচার্ড স্টনিয়ার, বাংলাদেশ যুব দলের স্ট্রেন্থ ও কন্ডিশনিং কোচ। বাংলাদেশের এই দলটার বিশ্বকাপ জয়ের পেছনে যে মানুষগুলোর সবচেয়ে বেশি অবদান, তাদের একজন তিনিই। 

স্টনিয়ারকে বিসিবি মূলত নিয়োগ দিয়েছিল 'বাংলাদেশ এ' দলের জন্যে। কিন্ত বছরখানেক আগে হঠাৎই তার হাতে তুলে দেয়া হয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ভার, তার দায়িত্ব ছিল স্ট্রেংথ এন্ড কন্ডিশনিং কোচ হিসেবে আকবর আলীর এই দলটাকে বিশ্বকাপের জন্যে প্রস্তুত করা। সেই কাজটা ভীষণ মনোযোগ দিয়ে করেছেন স্টনিয়ার, কাজ করতে করতেই ছেলেগুলোর বন্ধু হয়ে গিয়েছেন তিনি, রাকিবুল-নাবিলদের কাছের মানুষে পরিণত হয়েছেন স্টোনিয়ার। 

ছাত্রদের কাছ থেকে বাংলা কিছু শব্দও শিখেছেন স্টনিয়ার, এরইমধ্যে একটা হচ্ছে 'শেষ কোড়ে আশো', যেটার সফল প্রয়োগ তিনি ঘটিয়েছেন ফাইনালে। আরেকটা শব্দ তিনি শিখেছেন- কীড়ে বাই (কীরে ভাই), কোন কিছু মনমত না হলেই শব্দ দুটো ব্যবহার করেন স্টনিয়ার। ছাত্রদের সঙ্গে তার সম্পর্কটা কেমন, সেটা নিয়ে তিনিই বলছিলেন, ''আমি দেখেছি, এদেশের ছেলেরা কোচিং স্টাফদের স্যার বলে সম্বোধন করে। কিন্ত আমাকে ওরা ‘ভাই’ বলে ডাকে। তার মানে ওরা আমাকে ভালোবাসে, এভাবেই আপন করে নিয়েছে আমায়। আমাকে ওদের পরিবারের অংশ বানিয়ে নিয়েছে। গত এক বছরে ওরা যে আত্মত্যাগ করেছে তার ফল পেয়েছে। এই ট্রফিটা ওদের এটা প্রাপ্য। আমি ওদের মাঝে উদ্দীপনা তৈরি করার চেষ্টা করেছি। দেখানোর চেষ্টা করেছি, ওরা ওদের সেরাটা কীভাবে দেখাতে পারে।''
 
দায়িত্ব পাবার পরে স্টনিয়ার বলেছিলেন, এই দলটাকে শারীরিকভাবে তো বটেই, মানসিকভাবেও পরিপক্ক করে তুলবেন তিনি। সেই মিশনে স্টোনিয়ার কতটা সফল, সেটার সাক্ষ্য দেবে আকবর আলীর ঠান্ডা মাথার ব্যাটিং, রাকিবুলের দাঁতে দাঁত চেপে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে থাকা, কিংবা আইসিসির অফিসিয়াল পেজে নাবিলের দুর্দান্ত ইন্টারভিউটা। খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি স্টোনিয়ারকেও অনেকে বাংলাদেশের এউ বিশ্বকাপ জয়ের পেছনে মূল কৃতিত্বের দাবীদার হিসেবে মানছেন। স্টনিয়ার কিন্ত বিনয়ের সাথেই প্রত্যাখ্যান করলেন কথাটা, ‘আমি শুধু ওদের ধারণা বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ওদের মানসিকতা বদলানোর চেষ্টা করেছি। মাঠে এবং মাঠের বাইরে তারা মানসিকভাবে অনেক শক্ত। আমার দায়িত্ব স্ট্রেন্থ ও কন্ডিশনিং কোচের দায়িত্ব পালন করা। কিন্তু আমার ক্রিকেট ব্যাকগ্রাউন্ড থাকায় অন্যান্য বিষয়েও তাদের সহায়তা করার চেষ্টা করি। অনুশীলনে আমি তাদের বন্ধু ও মেন্টরের ভূমিকায় থাকি। তবে দিনশেষে মাঠে গিয়ে তো ওদেরকেই খেলতে হয়, ম্যাচ ওরাই জেতে।’

রিচার্ড স্টনিয়ার নিজের সবটুকু ঢেলে দিয়েছেন বাংলাদেশের এই দলটার পেছনে, নিজেকে উজাড় করে দিয়ে শিখিয়েছেন তার ছাত্রদের। প্র্যাকটিস, ম্যাচের আগে টিম স্পিরিট, প্রতিপক্ষকে হারানোর সব মন্ত্র এমনকি মাঠে ক্রিকেটারদের মাথা থেকে মানসিক চাপ দূরে রাখার সব কাজ স্টোনিয়ার সামলেছেন দারুণভাবেই। আকবর আলীরা শিরোপাটা জিতে তাদের গুরু, তাদের প্রিয় বন্ধুকে প্রতিদান দিয়েছেন। গুরু-শিষ্যের সম্পর্কটা যেখানে এমন মধুর, সেখানে সাফল্য তো ধরা দেবেই!


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা