ধৈর্যশীল ব্যাটিং আর ঠান্ডা মাথায় ম্যাচ শেষ করে আসার জন্য নায়ক বনে গিয়েছেন আকবর আলি। কিন্তু মাংশপেশির চোট নিয়েও পারভেজ হোসেনের বুক চিতিয়ে লড়াই করার গল্পটা ভুলতে পারবেন কখনো?

প্রতিপক্ষের বোলারদের তুলোধুনো করে শুধু চার-ছয়ের ফুলঝুরি সাজিয়ে ব্যাট করাটাকেই সব সময় সাহসিকতা বলে না। বরং ধ্বংসস্তূপে থাকা দলকে উদ্ধার করার জন্য গুরুতর চোটের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নামাটাও সাহসিকতার প্রকৃত উদাহরণ হতে পারে। মাংসপেশিতে চোট নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দৌড়ে নেওয়া একেকটি রান হতে পারে সাহসী সৌন্দর্যের নিদর্শন। সেই নিপুণ সৌন্দর্যের প্রদর্শনী দেখিয়েছিলেন বাংলাদেশ অনুর্ধ্ব-১৯ দলের ক্রিকেটার পারভেজ হোসেন ইমন। 

যুব বিশ্বকাপের ফাইনাল জিততে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ১৭৮ রান। সেই লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে তানজিদ হাসান তামিমকে সঙ্গী করে দলকে দারুণভাবেই এগিয়ে নিচ্ছিলেন পারভেজ। নির্বিঘ্নেই বাংলাদেশকে ৫০ রান এনে দিয়েছিল এই জুটি। ভারতীয় পেসারদেরকে খুবই স্বাচ্ছন্দ্যে মোকাবেলা করেছেন তারা। পেসাররা যখন পাত্তা পাচ্ছিলেন না বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কাছে, তখনই আক্রমণে আসেন লেগস্পিনার রবি বিষ্ণয়। তিনিই বাংলাদেশের সহজ ম্যাচটাকে কঠিন করে তুলেছিলেন।

৫০ রানে কোন উইকেট না হারানো বাংলাদেশ ৬৫ রানেই হারায় ৪ উইকেট। সবগুলো উইকেটই নিয়েছিলেন বিষ্ণয়। এরই মাঝে ত্রয়োদশ ওভারে দ্বিতীয় উইকেট হিসেবে মাহমুদুল হাসান আউট হওয়ার পর মাংসপেশিতে টান লেগে তার সাথে মাঠ ছাড়েন পারভেজ হোসেনও। তার চোট এতটাই গুরুতর ছিল যে তিনি খেলার জন্য এতটুকুও ফিট ছিলেন না। কিন্তু দলের ইনিংস যখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে গেছে তখন ব্যথায় যন্ত্রনায় কাতরাতে থাকা পারভেজ আর বসে থাকতে পারলেন না। বিশ্বকাপ স্পর্শ করার এত নিকটে এসে বাংলাদেশকে হারতে দেখবেন, এটা কোনভাবে মেনে নিতে পারলেন না যেন। ব্যাট-প্যাড গুছিয়ে আবারো নেমে পড়লেন ২২ গজে। 

দল তখনও শিরোপা জয় থেকে ৭৬ রান দূরে! হাতে উইকেট আছে মাত্র ৪টি। কঠিন এই সমীকরণ মেলাতে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। অসুস্থ শরীর নিয়ে সেই পথ পাড়ি দেওয়ার চ্যালেঞ্জ নিলেন পারভেজ। তবে তাকে ভরসা দেওয়ার জন্য অপরপ্রান্তে ছিলেন অধিনায়ক আকবর। পারভেজের জন্য তখন প্রতিপক্ষ শুধু ভারতই ছিল না। বরং মাংশপেশির চোট, স্নায়ুচাপ, ভারতীয় বোলারদের আগ্রাসন, ফিল্ডারদের স্লেজিং সবকিছুই তখন তার জন্য প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ১৭ বছর বয়সী পারভেজ সব প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই লড়াই করেছেন বুক চিতিয়ে। 

পারভেজ হোসেন ইমন

পেছন থেকে ভারতীয় ফিল্ডাররা যখন স্লেজিং করে তাকে যথেষ্ট বিরক্ত করছিলেন তখন তিনি দুই পা এগিয়ে শট খেলেছিলেন, আক্রমণাত্মক হতে গিয়ে নিজেকেই নিজে শান্ত থাকার বার্তা দিয়েছিলেন কয়েকবার। ভারতীয় বোলাররা যখন তাকে চোখ রাঙাচ্ছিলেন, তখন তিনিও জবাব দিয়েছেন চোখ রাঙিয়েই। ভয়ঙ্কর বোলার বিষ্ণয়ের আগ্রাসনের জবাবে তাকে হাঁকিয়েছেন বাউন্ডারি। কিন্তু মাংসপেশির চোটটা ভালই ভুগিয়েছিল তাকে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তিনি দলের ইনিংসকে এগিয়ে নিয়েছেন অনেক দূর! 

ডিফেন্সিভ খেলে রান তোলার আগেই আউট হয়ে যাওয়ার চেয়ে একটু আক্রমনাত্মক খেলে দলের রান এগিয়ে নেওয়াটাই তার কাছে সঠিক পথ ছিল। তিনিই সেটাই করেছেন। আকবরের সাথে ৪১ রানের জুটিতে তার অবদান ছিল ৩৪ বলে ২২ রান। অতিরিক্ত খাত থেকে এসেছিল ৪ রান। বাকী ১৫ রান এসেছিল আকবরের ব্যাট থেকে। তাদের এই জুটিতে পাঁচটি চারের তিনটিই এসেছিল পারভেজের ব্যাট থেকে। যশস্বী জসওয়ালের বলে আউট হওয়ার আগে বাংলাদেশকে অনেকটাই নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। ৭৯ বলে ইংনিস সর্বোচ্চ ৪৭ রান করে তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ফিরে গেছেন প্যাভিলিয়নে, ব্যথায় কাতরাতে থাকা এই ওপেনারকে সেখানেও ম্যাচ শেষ করে না আসার জন্য আক্ষেপ করতে দেখা গিয়েছিল। 

২০১৮ সালের এশিয়া কাপে ভাঙা হাত নিয়ে ব্যাট করে তামিম যে বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন, তা আজও ভুলেনি বাংলাদেশীরা। এখনও কাউকে এমন বীরত্ব প্রদর্শন করতে দেখা গেলে, তামিমের কথা স্মরণ করেন তারা। 

তামিমের মতো হয়তো ভাঙা হাত নিয়ে ব্যাট করেননি পারভেজ, কিন্তু মাংসপেশির চোট নিয়েও যে বীরত্ব দেখিয়েছেন তিনি তা কি কখনোই ভুলতে পারবে বাংলাদেশ? তার এমন নিবেদনের কারণে নিজেকে গর্বিত মনে করছেন ম্যাচের নায়ক আকবরও, 'ইমন (পারভেজ) নিজের জাত চিনিয়েছে। এমনকি সে ৩০ শতাংশও ফিট ছিল না। ইমন যখন ক্র্যাম্পের কারণে ড্রেসিংরুমে আসে, নতুন দুই ব্যাটসম্যানকে নিয়ে দল তখন প্রচন্ড চাপে। আধিপত্য করছিল ভারত। ষষ্ঠ উইকেট হারানোর পর ইমন ফিরে যেভাবে ব্যাটিং করল…আমি সত্যিই তার জন্য গর্বিত।'

বাংলাদেশের ইতিহাস গড়ার দিনে আকবর আলির দুর্দান্ত ইনিংসের পরেও নিশ্চিতভাবেই আড়ালে হারিয়ে যাবে না পারভেজের সাহসী ইনিংসটি। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা