মুন্নাকে নিয়ে যত বলাই হোক তাও কম হয়ে যায়, থেকে যায় অনেক কথা। ১৯৯১ সালের দল বদলে মুন্না রেকর্ড ২০ লক্ষ টাকা পারিশ্রমকে খেলেছিলেন, দীর্ঘ সময় পর্যন্ত এই পারিশ্রমিক উপমহাদেশে ছিল অনন্য এক রেকর্ড।

মোহাম্মদ আসিফ: ১৯৮২ সাল, বাংলাদেশ জাতীয় দলের বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে নারায়নগঞ্জের হয়ে খেলছে ১৪ বছরের এক বালক। বলাবাহুল্য তিনি রক্ষণে খেলে এতটাই মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন যে তৎকালীন বাফুফে জেনারেল সেক্রেটারি ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের বলেই ফেললেন, তিনি এমন একজন সোনার ছেলে খুঁজে পেয়েছেন যে এখনই জাতীয় দলের হয়ে খেলার যোগ্য! জাতীয় দলের বিপক্ষে রক্ষণভাগের খেলোয়াড় হয়েও এমন প্রশংসা কজনের ভাগ্যে জোটে! ১৪ বছরের প্রতিভাবান সেই বালক পরের বছরে যোগ দিলেন দ্বিতীয় বিভাগের দল মুক্তিযুদ্ধা সংসদে, এবং দলটি এরপর উঠে এলো প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগে। এই বালক এক সময়ে হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশ ফুটবলের সমার্থক। যিনি শুধু বাংলাদেশে জনপ্রিয় নয়, সমান বা বলতে গেলে ততোধিক জনপ্রিয় পশ্চিমবঙ্গে।

এই মানুষটির কথা বলতে গেলে কোন ভূমিকার প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় না ‘কিং ব্যাক’ এই দুই শব্দের বেশি কিছু। ফুটবলে আসলেন, খেললেন, জয় করলেন। একদম সহজ, জটিল কোন সমীকরণ নয় বাংলাদেশ ফুটবল কিংবদন্তি মোহাম্মদ মোনেম মুন্নার জন্য। ডিফেন্ডার হয়ে ফুটবল অঙ্গনে নিজেকে তিনি যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তেমনটি সম্ভবত কেউ পারেননি এই উপমহাদেশে।

মাঠে একজন ডিফেন্ডার কতটা প্রভাব রাখলে সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় একজন ফুটবলার হয়ে উঠতে পারেন তা সহজেই অনুমেয়। মাঠে মুন্না ছিলেন অসামান্য দক্ষ, ক্ষিপ্র এবং প্রায় নির্ভুল। কেউ মুন্নাকে কাটিয়ে বল নিয়ে যাবে এমনটা হয়তো দর্শকরা কল্পনাতেও ভাবতে পারত না। ঢাকার ফুটবলের ঐ সময়ের জনপ্রিয় স্ট্রাইকার সাব্বির বলেন, 'সে সবসময় বিশ্বাস করত কেউ তাকে ড্রিবল করে পার হতে পারবে না এবং অত্যন্ত দক্ষ তিনি। তার শক্তিশালী ট্যাকলের স্বাদ যে ফরোয়ার্ড পেয়েছে সেই বুঝেছে কি ছিল তা।'

মোনেম মুন্না

ভালো ফ্রি কিক নিতে পারতেন মুন্না।যত দিন খেলেছেন, মাঠ মাতিয়েছেন, দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন অল্প সময়েই এবং একসময় নিজের করে নিয়েছেন ‘কিং ব্যাক’ উপাধি। শুধু ঢাকার ফুটবল না, কলকাতার ফুটবলেও মোনেম মুন্না এমন এক জনপ্রিয় নাম যিনি জায়গা করে নিয়েছেন ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবের ‘হল অব ফেম’-এ। বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার সেরা এই খেলোয়াড় ১৯৯১ ও ১৯৯৩ এই দুই মৌসুম খেলেছেন ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় ক্লাব ইস্ট বেঙ্গলে।

এখনো কলকাতার মানুষের মুখে মুখে ঘুরে মুন্নার নাম। তারা অবলীলায় স্বীকার করে মুন্নার অবদান। মাত্র দুই মৌসুমে খেলে কলকাতাতে নিজের যে কিংবদন্তি রেখে এসেছেন তা আজও বিদ্যমান। ইস্ট বেঙ্গলের হয়ে খেলা দুই মৌসুমেই জিতেছেন লিগ শিরোপা ও একটি ফেডারেশন কাপ, ক্লাবটির হয়ে গোল করেছেন দুইটি। ইস্ট বেঙ্গলের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে মুন্নার সম্পর্কে বলা হয়েছে, 'শক্তিশালী ডিফেন্ডার যিনি একজন দারুণ ট্যাকলার এবং হেডার।' সপ্রতিভ এই ডিফেন্ডার ছিলেন একজন অসাধারণ প্রতিভা, রক্ষণের দুর্ভেদ্য দেয়াল হলেও লং পাসেও ছিলেন দারুণ দক্ষ ও নির্ভুল। ইস্ট বেঙ্গলের হয়ে খেলার সময় মুন্নার কোচ নইমুদ্দিন তাকে খেলালেন একজন লিবেরো বা সুইপার হিসেবে।

পঞ্চাশের দশকে ইতালির ফুটবলের কাতেনাচ্চো ফরমেশনের হাত ধরে উঠে আসা এই পজিশন এক সময় ছিল ব্যাপক জনপ্রিয় এবং আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের জন্য এক আতংকের নাম। দারুণ চ্যালেঞ্জিং এই পজিশনে খেলতে হলে অসাধারণ একজন না হয়ে উপায় নেই। ৩-৫-২ ফর্মেশনে সুপার থাকে মূলত ডিফেন্স লাইন ও গোলরক্ষকের মাঝামাঝি, যার দায়িত্ব ব্যাপক পরিসরে। অল্প কথায় বললে ডিফেন্স লাইনের নিচে অনেকটা ফ্রি রোলে খেলা সুইপার প্রতিপক্ষের হঠাৎ করে ছুটে আসা প্রতিআক্রমণ থামিয়ে দেওয়া, ডিফেন্স লাইনের ভুলে বের হয়ে যাওয়া বল ‘ক্লিয়ার’ করার পাশাপাশি সাহায্য করে সতীর্থদের প্রতিআক্রমনেও। তাই সুইপার হিসেবে খেলতে একজন খেলোয়াড়কে শক্তিশালী, ক্ষিপ্র ও দক্ষ ট্যাকলার হওয়ার পাশাপাশি লং পাসও ভালো খেলতে হয়। সুইপার হিসেবে খেলার সব গুণই ছিল কিংবদন্তি মুন্নার, তাই কোচ নইমুদ্দিন সহসা এই পজিশনেও খেলালেও মুন্না ছিলেন সফল।

ইস্ট বেঙ্গলের ঘরের ছেলে হয়ে উঠলেন মুন্না, হলুদ-লাল জার্সির একজন কিংবদন্তিও। আনন্দ বাজার পত্রিকা মুন্নাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের লেখায় এমনটিও উল্লেখে করে যে ইস্টবেঙ্গলের হয়ে শেষ হয়ে যাওয়া অনেক ম্যাচের ত্রাণকর্তা ছিলেন মুন্না। ব্রাদার্স ইউনিয়ন থেকে ১৯৮৭ সালে ঢাকা আবাহনীতে যোগ দেওয়ার পর ক্যারিয়ারের শেষ সময় পর্যন্ত খেলেছেন আকাশি নীল জার্সি গায়ে। খেলোয়াড় হিসেবে জিতেছেন টানা দুই লিগ শিরোপা, ক্লাবটির অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলেন ১৯৯৩-১৯৯৫ পর্যন্ত।

ছবি কৃতজ্ঞতা- কিরণ

মাত্র ১৮ বছর বয়সে জাতীয় দলের খেলার সৌভাগ্য খুব কম ফুটবলারের হয়, মোনেম মুন্নার সেই সৌভাগ্য হয়েছিল। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৭ টানা ১১ বছর দুর্দান্ত প্রতাপে খেলেছেন জাতীয় দলে, হয়েছিলেন জাতীয় দলের অধিনায়ক। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রথম কোন আন্তর্জাতিক শিরোপা জয় করে, ১৯৯৫-তে মায়ানমারে অনুষ্ঠিত চার জাতি টুর্নামেন্ট ছিল আমাদের প্রথম কোন আন্তর্জাতিক শিরোপা। একই বছর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে মুন্নার অধীনে বাংলাদেশ দল রানার্সআপ হয়। আলো ছড়িয়েছেন নিজের ক্যারিয়ার জুড়ে, সেই আলোতে বাংলাদেশকেও এনে দিয়েছেন সাফল্যের স্বাদ। তাই আজও কিং ব্যাক মুন্না বাংলাদেশ ফুটবলে অনুপ্রেরণার নাম। 

মুন্নাকে নিয়ে যত বলাই হোক তাও কম হয়ে যায়, থেকে যায় অনেক কথা। ১৯৯১ সালের দল বদলে মুন্না রেকর্ড ২০ লক্ষ টাকা পারিশ্রমকে খেলেছিলেন, দীর্ঘ সময় পর্যন্ত এই পারিশ্রমিক উপমহাদেশে ছিল অনন্য এক রেকর্ড। সময়ের বিচারে টাকার অংকটা বিচার করলে সত্যি চমকে যেতে হয়। যদিও একজন মুন্নাকে টাকার অংকে বিচার করা যায় না, মুন্না এমনই একজন খেলোয়াড় ছিলেন। খেলোয়াড় মুন্নার পাশাপাশি ম্যানেজার মুন্নাও ছিলেন সফল, ফুটবল থেকে অবসরের পর ম্যানেজার হিসেবে আবাহনীকে তিনি এনে দেন প্রিমিয়ার ডিভিশন শিরোপা, ফেডারেশন কাপ ও ন্যাশনাল ফুটবল লিগ শিরোপা।

খেলোয়াড় হিসেবে অবসর নিয়েছিলেন ১৯৯৭ সালে, এরপর ফুটবলকে অনেক কিছু দেওয়ার ছিল রক্ষণকে শিল্পে পরিণত করা মানুষটির। কিন্তু সেই সুযোগ পাননি, কিডনিজনিত সমস্যায় মাত্র ৩৯ বছর বয়সে ছেড়ে যান পৃথিবী। বাংলাদেশ ফুটবলের বিখ্যাত কোচ অটো ফিস্টার, যিনি আফ্রিকার টোগো দলটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর বিশ্বকাপের মঞ্চে। অটো ফিস্টার বলেছিলেন, 'মুন্না ভুলবশত বাংলাদেশে জন্মেছিলেন।' ভুল দেশে তিনি জন্মগ্রহণ করেননি সত্যি, কিন্তু ভুল মানুষদের দেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। মোনেম মুন্নার অবদান ও কিংবদন্তি অনুধাবন করে যে আরো অনেক প্রতিভা ফুটবলে উঠে আসবে, তেমন কোন উদ্যোগ নেই। এই ব্যর্থতার দায়মোচন করবে কীভাবে বাফুফে?


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা