বিশ্বকাপ খেলে আসা বিশ্বমানের ফুটবলার ড্যানিয়েল কলিন্দ্রেসের সাথে খেলার প্রভাবটা পড়েছে জাতীয় দলের পারফরম্যান্সেও, দাবি করছেন বাংলাদেশি এই ফুটবলার।

ম্যাচের বয়স তখন ১৫ সেকেন্ড, সল্টলেকের ৮০ হাজার দর্শক তখনও ঠিকভাবে আসন পেতে বসেননি। মিডফিল্ডার সোহেল রানার থেকে বল নিয়েই দ্রুত ডিবক্সের ভিতরে ঢুকে পড়লেন তিনি। তার গতির সাথে না পেরে সরাসরি তাকে ফেলে দিলেন ভারতের রাইটব্যাক রাহুল বেকে।

কিছুক্ষণ পর আবারো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এবার নিজের একক প্রচেষ্টায় লেফট উইং দিয়ে বল টেনে নিয়ে ডিবক্সে প্রবেশ করলেন তিনি। এবারো তার গতির কাছে পরাস্ত হলেন রাহুল বেকে। তাকে থামানোর একমাত্র উপায় সরাসরি তাকে ফেলে দেওয়া। বরাবরের মতো সেটাই করলেন ভারতীয় রাইটব্যাক। 

ম্যাচ পরবর্তী বিশ্লষণে স্টার স্পোর্টসের বিশ্লেষকরা বলেছিলেন দুটিই পেনাল্টি হতে পারতো। কিন্তু সে যাত্রায় তাকে হতাশ করেছিলেন রেফারি। ম্যাচজুড়ে তার অসাধারণ পারফরম্যান্স নজর কেড়েছিল সবার। উদান্ত সিং-সুনীল ছেত্রীদের গতির ঝলক দেখতে আসা ভারতীয় সমর্থকেরা মুগ্ধ চোখে দেখে নিল তার গতির ঝড়। ভারতীয় ক্লাব ইস্ট বেঙ্গলের সমর্থকেরা তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে নিয়ে নিজেদের প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছিলেন। 

এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন তিনি কে? বলছিলাম বাংলাদেশ জাতীয় দলের লেফট উইঙ্গার মোহাম্মদ ইব্রাহিমের কথা। ফুটবল পাড়ায় তিনি 'ইব্রা' নামে পরিচিত। কি! ইব্রা? ঠিকই শুনছেন। ফুটবল সংশ্লিষ্ট অনেকেই তাকে ইব্রা বলে ডাকেন। না, সুইডেনের জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের মতো তিনি হয়তো এখনো ফুটবলে সুপারস্টার হতে পারেননি। ইব্রাহিমোভিচের মতো বাকপটুও নন তিনি। কিন্তু নামের মিল থাকায় ইব্রাহিমোভিচের ডাকনামের তকমাটা ঠিকই লেগে গেছে তার গায়ে। 

২০১৩ সালে মুক্তিযোদ্ধার জার্সি গায়ে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগে অভিষেক হয় ইব্রাহিমের। দুই বছর পর ঐতিহ্যবাহী ক্লাব মোহামেডানে যোগ দেন তিনি। সেখানেই নিজের প্রতিভার জানান দেন কক্সবাজার থেকে উঠে আসা এই তরুণ। ফুটবল কর্তাদের নজর কেড়ে জায়গা করে নেন বাংলাদেশের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলে। সেখানেও দারুণ খেলেছিলেন। ২০১৬-১৭ মৌসুমে চট্টগ্রাম আবাহণীর হয়ে খেলে,  পরের মৌসুমেই তিনি যোগ দিয়েছিলেন সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবে। 

২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগে আবির্ভাব ঘটে বসুন্ধরা কিংসের। নিজেদের প্রথম মৌসুমেই শক্তিশালী দল গঠন করা বসুন্ধরা কিংস দলে ভিড়িয়েছিল ইব্রাহিমকেও। সেই বছরই বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপে লাওসের বিপক্ষে বাংলাদেশ জাতীয় দলে অভিষেক হয় তার।

শুরুতে নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে না পারলেও সময়ের সাথে সাথে তার খেলায় অনেক উন্নতি হয়েছে। আর তাই এখন জেমি ডে'র নিয়মিত একাদশের সদস্য তিনি। নিজের উন্নতি সম্পর্কে ইব্রাহিম জানান, 'ম্যাচ খেলার সময় ভিন্ন ভিন্ন সিচুয়েশনে পড়েছি, আর প্রতিটি সিচুয়েশনে আমি শিখেছি। আমার অভিজ্ঞতা বেড়েছে। আর এভাবেই আমার উন্নতিও হয়েছে।'

বসুন্ধরা কিংসের আবির্ভাবের পর থেকেই তাদের হয়ে প্রায় নিয়মিতই খেলেছেন ইব্রাহিম। তবে নিজের স্বাভাবিক লেফট উইং পজিশন ছেড়ে কিংসে তিনি বেশিরভাগ ম্যাচেই খেলেছেন লেফট উইংব্যাক হিসেবে। কারণ, তার পজিশনে বসুন্ধরা কিংস খেলিয়েছে তাদের সেরা চমক রাশিয়া বিশ্বকাপ খেলে আসা ফুটবলার ড্যানিয়েল কলিন্দ্রেসকে। সেই কলিন্দ্রেসের সাথেই ইব্রাহিমের গড়ে উঠেছিল দৃষ্টিনন্দন এক জুটি।

বসুন্ধরা কিংসের প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই একটি ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতো বারবার। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়েরা যখন কলিন্দ্রেসকে ঘিরে ধরতো ঠিক তখনই ঝড়ো গতিতে ওভারল্যাপ করে উপরে ওঠতেন ইব্রাহিম। ইব্রাহিমকে দেখে তার উদ্দেশ্যে পাস বাড়াতেন কলিন্দ্রেস। আর পাস পেয়েই প্রতিপক্ষের কয়েকজনকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে কলিন্দ্রেসের জন্য স্পেস তৈরি করতেন তিনি।

স্পেস তৈরির হওয়ার পর তার থেকে ফিরতি বল নিয়ে দারুণ সব সুযোগ তৈরি করতেন কলিন্দ্রেস। দুজনের সেরা কম্বিনেশনের এমন সুন্দর দৃশ্য দেখা যেতো বসুন্ধরা কিংসের প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই। ইব্রাহিম মনে করেন কলিন্দ্রেসের সাথে খেলার প্রভাব পড়ছে তার জাতীয় দলের পারফরম্যান্সেও,

''ক্লাবে ড্যানিয়েল (কলিন্দ্রেস) যে পজিশনে খেলে, জাতীয় দলে আমিও সেই পজিশনে খেলি। তাই ম্যাচের ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, প্রতিটি মুভমেন্ট, স্কিলের প্রয়োগ দেখে আমি শিখি এবং জাতীয় দলে গেলে তা প্রয়োগ করার চেষ্টা করি। ড্রেসিং রুমেও তিনি তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তার সাথে খেলে আমার ম্যাচিউরিটি বেড়েছে।''

ক্লাবে ডিফেন্ডার হয়ে খেলা ইব্রাহিম জাতীয় দলে হয়ে যান ফরোয়ার্ড। ভিন্ন ভিন্ন পজিশনে খেলা চ্যালেঞ্জিং হলেও ইব্রাহিমের চোখে সেটাও কিছুটা পজিটিভ, 'জাতীয় দলে সবাইকে একটু বাড়তি দায়িত্ব নিয়ে খেলতে হয়। ভারত, আফগানিস্তান, কাতার, ওমান, ফিলিস্তিনের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে প্রায় সবাইকেই রক্ষণ কাজে অংশ নিতে হয়। তাই ক্লাবে উইংব্যাক হিসেবে খেলে নিজের ডিফেন্সিভ স্কিলগুলো শক্তিশালী করেছি। যেগুলো জাতীয় দলে কাজে লাগাতে পারি। তবে নিয়মিত ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলতে পারলে অবশ্যই আমার গোল করার ক্ষমতা আরো বাড়তো।'

একটি ক্লাব একজন ফুটবলারের জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বসুন্ধরা কিংস শুধুমাত্র একজন ফুটবলারই নয় বরং পুরো বাংলাদেশ ফুটবলকে এগিয়ে নেওয়ার জন্যই কাজ করে যাচ্ছে নিরলসভাবে। ফুটবলারদের ভাল মানের পারিশ্রমিকের পাশাপাশি আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে ক্লাবটি। যা ফুটবলারদের উন্নতিতে অবদান রাখছে বলে মানছেন ইব্রাহিম,

'বসুন্ধরা কিংস অন্য সব ক্লাবের চেয়ে আলাদা। নিজস্ব জিমনেশিয়াম আছে, যেখানে ফিটনেস ট্রেনিং করা যায়। স্কিল ট্রেনিংয়ের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি আছে। যা ফুটবলারদের পারফরম্যান্সের উন্নতিতে সাহায্য করে। সত্যি বলতে, ক্লাবটি অন্যদের চেয়ে বেশি প্রফেশনাল।'

১৫ মাস আগে বাংলাদেশ জাতীয় দলে অভিষেক হওয়া ইব্রাহিম নিজের অভিষেক গোলটি করেছেন গত রবিবার শ্রীলংকার বিপক্ষে। পুরো ম্যাচে স্পিড আর ড্রিবিলিং দিয়ে নাচিয়ে ছেড়েছেন শ্রীলংকান ফুটবলারদের।

ম্যাচের ২১তম মিনিটে মাঝমাঠ থেকে শ্রীলংকান ৩ জন ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিয়ে তার সলো রানের প্রচেষ্টাটি ব্যাহত হয় শ্রীলংকান গোলরক্ষকের দেয়ালে। সেটি গোলে পরিণত হলে, টুর্নামেন্টের সেরা গোলের তালিকায় থাকতো নিশ্চয়ই। নিজের দৃষ্টিনন্দন ফুটবল দিয়ে ইব্রাহিম নজর কাড়েন ফুটবলপ্রেমীদের। তার প্রতিটি সলো রানে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় গ্যালারিতে। ইব্রাহিম কি পারবেন এভাবে নিয়মিত ফুটবলপ্রেমীদের উল্লাসে মাতাতে?  


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা