প্রেজেন্টেশনে সবার পরনে দুই নম্বর জার্সি, পেছনে আপনার নাম লেখা, সামনে লেখা আছে- থ্যাংক ইউ ক্যাপ্টেন। দেখে চোখ দুটো অশ্রুস্নাত হলো, গলার কাছটায় দলা পাকিয়ে ওঠা আবেগ যেন চিৎকার করেই জানান দিতে চাইলো ওদের সঙ্গে সঙ্গে- থ্যাংক ইউ ক্যাপ্টেন!

ম্যাচ প্রেজেন্টশনে কথা বলতে গিয়ে গলাটা কি একটু কাঁপলো? চোখের কোণে জমলো জল? ম্যাচ শেষে আর কখনও তো এভাবে নিয়ম করে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ানো হবে না, ধারাভাষ্যকার আপনাকে খুঁজে নেবেন না অবধারিতভাবে, ক্যামেরার চোখ তাক করা থাকবে না আপনার দিকেন আজই সব শেষ, তুলি দিয়ে সেই শেষ আঁচড়টা দেয়ার সময় একটুও কি খারাপ লাগেনি আপনার? মনটা ভেঙে শত-সহস্র টুকরা হয়নি? আমাদের তো হয়েছে মাশরাফি! 

ম্যাচ রিপোর্ট লেখার কথা ছিল। কিন্ত আজকের দিনে মাশরাফি ছেড়ে কেউ ম্যাচ নিয়ে কথা বলবে? মাশরাফি যে আজ ম্যাচের চেয়েও বড় কিছু! এর আগেও আপনি একবার বিদায় বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক টি-২০ থেকে। কলম্বোর মেঘলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে তার চেয়ে বেশি বিষণ্ণ মন নিয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন, শর্টার ভার্সনে বাংলাদেশের হয়ে আর খেলবেন না। সেদিন আপনার সতীর্থদের মধ্যে যে তাড়নাটা দেখেছিলাম, দলকে জেতানোর জন্যে নিজেদের সবটুকু ঢেলে দিতে দেখেছিলাম, সেই একই দৃশ্যটারই দেখা মিললো আজ সিলেটে। প্রেমাদাসা ফিরে এলো লাক্কাতুরায়, ফিরলো বৃষ্টিটাও, এরই মাঝে নড়াইল এক্সপ্রেস ট্রেনটা এসে থামলো সিলেট স্টেশনে! 

শেষটা আবেগে আক্রান্ত হবার মতোই। আপনাকে কাঁধে তুলে নিলেন সবাই মিলে, যেমনভাবে শচীনকে কাঁধে তুলে নিয়েছিল ভারত, জয়াবর্ধনে আর সাঙ্গাকারাকে কাঁধে তুলেছিল শ্রীলঙ্কান সতীর্থরা- সেভাবেই আপনাকে সম্মান জানাতে চাইলেন সবাই। এই কাঁধে আপনি পুরো বাংলাদেশের প্রত্যাশার ভার বয়েছেন, ষোলো কোটি মানুষের স্বপ্নের ভার বয়েছে আপনার দুই হাঁটু- এটুকু তো আপনার পাওনা! প্রেজেন্টেশনে সবার পরনে দুই নম্বর জার্সি, পেছনে আপনার নাম লেখা, সামনে লেখা আছে- থ্যাংক ইউ ক্যাপ্টেন। দেখে চোখ দুটো অশ্রুস্নাত হলো, গলার কাছটায় দলা পাকিয়ে ওঠা আবেগ যেন চিৎকার করেই জানান দিতে চাইলো ওদের সঙ্গে সঙ্গে- থ্যাংক ইউ ক্যাপ্টেন! 

থ্যাংক ইউ ক্যাপ্টেন!

আমাদের দেড়যুগের নিয়মিত টাইমলাইনে আপনি ছিলেন। আরও কিছুদিন থাকবেন। কলার উঁচিয়ে আপনার ছুটে আসা দেখে আমরা ক্রিকেটার হতে চেয়েছি, পেসার হবার স্বপ্ন দেখেছি। এদেশের কত সহস্র কিশোর তরুণ মাশরাফি হতে চেয়েছিলেন, তার ইয়ত্তা নেই। আপনি তো আমাদের প্লে-লিস্টে বাজতে থাকা পুরনো সেই গান, সবচেয়ে সুমধুর। কিংবা ল্যাপটপ হার্ডডিস্কের প্রিয় সিনেমাটা, বারবার দেখলেও যেটাকে নতুন লাগে। প্রতিবার দেখতে বসলে নতুন কিছু আবিস্কার হয় যেন! 

আপনি আমাদের কাছে অদ্ভুত একটা কবিতার মতো- তোমায় নতুন করে পাবো বলে হারাই ক্ষণে ক্ষণ! আমরা আপনার মাঝে হারাই। আপনার মুগ্ধতায় বিভোর হই। আমাদের ঘোর কাটে না। কিংবা বলা চলে, আপনি কাটতে দেন না সেই ঘোরটা। দেবুদা প্রশ্ন করেছিলেন সাকিবকে, বাংলাদেশের ক্রিকেটে মাশরাফি কি কোন মিথ? আমাদেরও মাঝেমধ্যে মনে হয়, আপনি কি বাস্তব, নাকি কোন কল্পনা?  

এইতো, এশিয়া কাপের কথা। ভাঙা হাত নিয়ে তামিম ইকবাল নেমে পড়ছেন আপনার এক কথায়, তামিমের গ্লাভস কেটে, গার্ড পরিয়ে তাকে প্রস্তুত করে দিচ্ছেন আপনি! ইনজুরিজর্জর দলটা যাতে সাকিবের অভাবে প্যানিকড হয়ে না পড়ে, সেজন্যে আপনি চেপে যান সবকিছু। ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলে মুশফিক এসে বলেন, 'মাশরাফি ভাই বলেছিলেন, হারার আগে হেরে যাওয়া যাবে না!' মুস্তাফিজ শেষ ওভারে ক্রাম্প নিয়েও দুর্দান্ত বোলিং করে ম্যাচ জিতিয়ে আনেন, বলেন, 'ভাই বলেছে, বোলিং তো করতেই হবে!' 

লিটন হাফসেঞ্চুরি করার পরে আপনার উদ্দেশ্যে বুকে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করেন, হয়তো ধন্যবাদ জানান, তার ওপরে ভরসা রাখার জন্যে। বুকে হাত দিয়ে আপনাকে তার পাল্টা জবাব দিতে দেখে আমাদের চোখের কোণ ভিজে যায়, সেখানে জল জমে। তামিম নেই, সাকিব নেই, মুশফিকও চোটে আক্রান্ত- সেই দলটা ফাইনাল ম্যাচে শেষ বল পর্যন্ত লড়ে গিয়েছিল শুধু আপনার জন্যে, মাশরাফি। আজও লিটন খেললেন আপনার জন্যে, তামিম সেঞ্চুরী হাঁকালেন, সেটাও আপনারই জন্যে মাশরাফি। আজও যেমন সাকিবকে স্মরণ করলেন এই মিলনমেলার মাঝখানে দাঁড়িয়েই! সমালোচনায় আপনি ওদের আগলে রেখেছেন, বটবৃক্ষ হয়ে ছায়া দিয়েছেন, এমন অধিনায়ক বাংলাদেশ আর কখনও পাবে না! 

বাংলাদেশের ক্রিকেটের যতো বড় অর্জন, প্রায় সবগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আপনার নাম, অনেকগুলো এসেছে আপনার হাত ধরে। অথচ আপনি কৃতিত্ব নিতে নারাজ, নিজেকে একজন এন্টারটেইনারের বেশি কিছু ভাবতে রাজী নন আপনি! অধিনায়ক হিসেবে আপনার শেষ ওয়ানডে, সেই ম্যাচেও আপনি উইকেট নিলেন, ঝাঁপিয়ে পড়ে রান বাঁচালেন- তবু আপনার ডেডিকেশন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, সেসবকে পাশ কাটিয়ে আপনি নিজের মতো করে পারফর্ম করার চেষ্টা করে যান। ডাক্তার হলে ফরেনসিক টেবিলে ফেলে আপনার শরীরটা কেটেকুটে দেখতাম, খোদা আপনাকে কোন জাতের মাটি দিয়ে বানিয়েছেন!

আপনি থাকবেন না, হাসিটা অমলিন থেকে যাবে

আমরা নাহয় দেখিনি, ডা. ইয়াং তো দেখেছিলেন। তার ছুরির নিচে কতবার যেতে হলো আপনাকে। আপনি হাঁটতে পারবেন না বলেও আশঙ্কা ছিল তার, সেই আপনি এখনও হাঁটুতে টেপ বেঁধে মাঠে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, কলার উঁচু করে ছুটে আসছেন রানআপ নিয়ে, সীমিত গতি নিয়েই আটকে রাখছেন প্রতিপক্ষের রানের চাকা, আদায় করে নিচ্ছেন উইকেট, এই ছত্রিশ বছর বয়সেও! সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় বসে কোন এক রাতে হয়তো ইউটিউবে আপনার ম্যাচের হাইলাইটস দেখতে বসেন ডা. ইয়াং, বল হাতে আগুয়ান আপনাকে ছুটে আসতে দেখে আনমনেই হয়তো মুচকি হাসেন তিনি। 

আপনি লম্বা রেসের ঘোড়া, জানতেন ইয়াং। জানি আমরাও। কিন্ত এটাও জানি, রেসটা একদিন শেষ হবে। প্লেলিস্টে বাজতে থাকা প্রিয় গানটা একদিন থেমে যাবে। ল্যাপটপে চলতে থাকা সিনেমাটার রানিং টাইমও শেষ হয়ে যাবে। জীবন অনেক সময় সিনেমার মতো। আবার কখনও আলাদা। এখানে পেছনে ফিরে যাওয়ার কোন অপশন নেই, কোনকিছু রিপিট করার কোন বাটন নেই। একটা সিনেমা বারবার দেখা যায়, একটা জীবন তো বারবার যাপন করা যায় না। 

এমন একটা দিন নিশ্চয়ই আসবে, যেদিন থেকে কলার উঁচিয়ে মাঠে আপনাকে আর ছুটে আসতে দেখা যাবে না। এমন একটা দিন নিশ্চয়ই আসবে, যেদিন সাদা ক্রিকেট বলটা হাতে নিয়ে আপনি আর রানআপ নেবেন না। এমন একটা দিন নিশ্চয়ই আসবে, যেদিন সকালে উঠে আপনাকে রানিং-স্ট্রেচিং করতে হবে না, দেড়ঘন্টা সময় নিয়ে হাঁটুতে টেপ বাঁধতে হবে না। গল্পটায় দাঁড়ি পড়ে যাবে চিরদিনের মতো। সেই দিনটা আসবে, আমরা জানি। কিন্ত সেটার জন্যে কি আমরা প্রস্তুত? একটাই উত্তর- না! 

দশ বছর ধরে আপনি টেস্ট খেলেন না। হুট করেই টি-২০ ছাড়ারও তিন বছরের বেশি হয়ে গেছে। কই, মানিয়ে নিয়েছি তো! মিস করি, মনে পড়ে, কিন্ত ব্যাথা হয় না আর। জীবন তো এমনই, মানিয়ে নেয়ার। তবুও স্বান্তনা খুঁজে পাই একটা জায়গায়, মাশরাফি তো ওয়ানডে খেলছেন এখনও, মজা হচ্ছে এখানে! একদিন সেটাও শেষ হয়ে যাবে, আজ তো অধিনায়কত্বটাও ছেড়ে দিলেন। দিন ঘনিয়ে আসছে, এক কুড়ি, দুই কুড়ি গুণে দিন মাস বছরের হিসেব বের করে ফেলা যাবে। কিন্ত মন মানছে না, মানবেও না। আমাদের অনেকের কাছেই তো ক্রিকেটের প্রতিশব্দ আপনি। কারো কারো কাছে হয়তো জীবনের প্রতিশব্দও! কিন্ত ওই যে, জীবনের ধর্মই তো মানিয়ে নেয়ার! 

বছর কয়েক পরে কোন এক আলসে বিকেলে অফিস ফেরত ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিয়ে চোখ দেবো টিভির পর্দায়। লাল-সবুজের জার্সিধারীরা খেলবে হয়তো, যারা আপনার ছায়াতলে বেড়ে উঠছে এখন, আপনাকে বড়ভাই মানে যারা, ওরাই হয়তো একটা সময়ে দলের প্রাণভোমরা হবে। রুবেল হয়তো স্ট্যাম্প ভেঙে দেবেন, মিরাজ টপাটপ তুলে নেবেন উইকেট। সৌম্য-লিটনরা চার-ছক্কার ফুলঝুরি সাজাবেন, দশ হাজার ওয়ানডে রানের মাইলস্টোনটা ছুঁয়ে ফেলবেন তামিম, দলটাকে এক সুতোয় গাঁথবেন সাকিব। তবুও, কোন কঠিন মূহুর্তে, কোন আসন্ন বিপদের মুখে আপনার কথাই মনে পড়বে সবার আগে, ইশ, এখন মাশরাফি থাকলে কি হতো... 

আমরা নস্টালজিক হবো, স্মৃতির পাতায় হারাবো, ফেলে আসা কোন এক উপন্যাসে ডুব দেবো। নস্টালজিয়ায় ভরা সেই উপন্যাসের প্রতিটা পাতায় নায়কের নাম লেখা থাকবে। সেই নামটা আপনার, মাশরাফি! পড়তে পড়তে আবেগে রুদ্ধ হবো আমরা, চশমার কাঁচে বাস্প জমবে। সেই বাস্প মুছে আমরা আবার জীবনে ফিরে যাবো, যে জীবন চায়ের কাপের টুংটাং শব্দে বাঁধা পড়ে থাকে, যে জীবনে নয়টা-পাঁচটার পাঁচালি লেখা হয় হররোজ। শুধু নিয়ম করে হুটহাট বেজে ওঠে সেই পুরনো গান, ফিরে আসে সেই চিরাচরিত আবেশ, মাশরাফি যে আবেশের অন্য নাম!


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা