"Quality football without result is pointless. Result without quality football is boring." ... Johan Cruyiff

কি এক বিরল দৃশ্য। নিজেদের ঘরের মাঠ নীলফামারীতে প্রথমবারের মতো পরাজয়ের স্বাদ নিতে হলো বসুন্ধরা কিংসকে। জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে রাখা তপু বর্মনের চেহারাই বলে দিচ্ছিলো পুরো ম্যাচের প্রতিচ্ছবি। করোনাভাইরাসের প্রকোপের কারণে মাঠে কাল দর্শক ছিল না। নয়তো তপুর এমন হতাশার চিত্র ছড়িয়ে পড়তো গ্যালারিতেও। এভাবেও যে কেউ ফিরে আসার গল্প রচনা করতে পারে, তা কি কখনো দেখেছে বাংলাদেশ? হয়তো দেখেছে। কিন্তু গতকাল চট্টগ্রাম আবাহনী ৩ গোলে পিছিয়ে পড়ার পরেও, শেষ ৩২ মিনিটের ঝড়ে ৪-৩ গোলের ব্যবধানে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ার গল্পটা সত্যিই অবিশ্বাস্য! তাদের এই অবিশ্বাস্য গল্প তৈরির নায়কটা মাঠে খেলেননি। খেলেছেন ডাগ আউটে দাঁড়িয়ে। বলছি, চট্টগ্রাম আবাহনীর কোচ মারুফুল হকের কথা। পাসিং ফুটবলপ্রেমী এই কোচের দর্শনে রয়েছে ফুটবল গ্রেট ইয়োহান ক্রুয়েফের ছাপ। সাথে আলতো ছাপ রয়েছে বর্তমান জুভেন্টাস কোচ মারিজিও সারির। 

শুরুটা যে উক্তি দিয়ে করেছিলাম, নেদারল্যান্ড ও বার্সেলোনার কিংবদন্তী ক্রুইয়েফের সেই বিখ্যাত উক্তিতে আবারো ফিরে যাই। তিনি বলেছিলেন, 'ফলাফল ছাড়া কোয়ালিটি ফুটবল মানে পয়েন্টশূন্য। আবার, কোয়ালিটি ফুটবল ছাড়া ফলাফলও বিরক্তিকর।' ক্রুইয়েফের এই দর্শনটাই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছিল মারুফুলের উপর। সবকিছু ছাপিয়ে তার কাছে কোয়ালিটি ফুটবলটাই হয়ে উঠেছিল মুখ্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলগুলো কোয়ালিটিহীন বিরক্তিকর ডিফেন্সিভ ফুটবল খেলে ঠিকই বড় দলগুলোকে আটকে দিচ্ছে। পয়েন্ট ভাগিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু তাতে কি! দেশের অন্যতম সেরা কোচ মারুফুলের কাছে কোয়ালিটিটাই সবার আগে।

গত বছর মাঝারী মানের দল আরামবাগকে নিয়ে তিনি যে দৃষ্টিনন্দন ফুটবল উপহার দিয়েছিলেন তা নজর কেড়েছিল দেশের সকল ফুটবলপ্রেমীর। কিন্তু ভালো ফুটবল খেলেও কয়েকটি ম্যাচে ফলাফল তাদের পক্ষে আসেনি। তাই, মৌসুম শেষে লীগ টেবিলের পঞ্চমস্থানে থাকতে হয়েছে আরামবাগকে। এ মৌসুমে দল বদলে ফেলেছেন মারুফুল। আরামবাগ ছেড়ে যোগ দিয়েছেন চট্টগ্রাম আবাহনীতে। দল বদলালেও নিজের কোচিং দর্শন বদলাননি। কোয়ালিটির ব্যাপারেও তিনি কোনো আপোষ করেননি। তবে এবার কোয়ালিটি ফুটবল খেলার জন্য কয়েকজন ভালো মানের ফুটবলারও সাইন করিয়েছেন তার দলে। শুধু তার দর্শনের সাথে মানানসই, এমন ফুটবলারদেরই চট্টগ্রামের দলটিতে ভিড়িয়েছেন এই কোচ। তাইতো ফলাফলটাও যেনো তার পক্ষেই আসছে। এই মৌসুমে দুইবার মুখোমুখি হয়েছেন বর্তমান লীগ চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংসের বিপক্ষে। দুই বারই জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে তার দল। আরেক জায়ান্ট ঢাকা আবাহনীর মুখোমুখি হয়েছেন একবার। অতিথি দল হয়েও ঢাকা আবাহনীকে পরাজয়ের স্বাদ দিয়েছে মারুফুলের চট্টগ্রাম আবাহনী। 

নীলফামারীতে বসুন্ধরা কিংসের বিপক্ষে চট্টগ্রাম আবাহনীর খেলাটা শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, লড়াইটা গড়িয়েছে ডাগ আউটেও। দুই দলের ডাগ আউটে দাঁড়িয়েছিলেন দুই মাস্টার মাইন্ড অস্কার ব্রুজন এবং মারুফুল হক। টোটাল ফুটবলের জনকখ্যাত ইয়োহান ক্রুইয়েফ একবার বলেছিলেন, 'ফুটবলটা তুমি মাথা দিয়ে খেলো, পা গুলো সেখানে রয়েছে তোমাকে সাহায্য করার জন্য।' ফুটবলটা আসলেই মাথার খেলা। আরেকটু স্পষ্ট করে বললে, এটা বুদ্ধির খেলা। মস্তিষ্ক দিয়েই নিয়ন্ত্রন করতে হয় এই খেলাটাকে। ডাগ আউটে দাঁড়িয়ে কোচরা সেই কাজটাই করেন। ফুটবলে কোচের ভূমিকাটা তাই মুখ্য। 

কোচ হিসেবে অস্কার ব্রুজনও পাসিং ফুটবলপ্রেমী। ক্রুইয়েফের দর্শন ফুটে উঠে তার ট্যাক্টিসেও। একই দর্শনের অনুসারী মারুফুলকে রুখতে তার ট্যাক্টিসে কি পরিবর্তন আসে, সেটা দেখাই ছিল আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। ম্যাচে অস্কারের দল বসুন্ধরা কিংসের ফরমেশন ছিল ৪-৪-২। ফিলোসফি বলছে, এই ফরমেশনে দুজন 'বক্স স্ট্রাইকার' থাকবে। যাদের কাজ হচ্ছে দুই প্রান্ত থেকে আসা ক্রসগুলোকে গোলে রুপান্তর করা। দুই স্ট্রাইকারকে তাই এরিয়ালে খুবই শক্তিশালী হতে হয়। এই ফরমেশনের বিল্ড আপটা মূলত দুই উইং ধরে হয়। ফুলব্যাকদের খুবই সক্রিয় থাকতে হয়। অথচ অস্কারের লাইন আপে কোনো জাত স্ট্রাইকার ছিল না। যে দুজন ছিলেন তারা কেউই ট্রেডিশনাল 'নাম্বার নাইন'- এ খেলে অভ্যস্ত নয়। কলিন্দ্রেস এবং বখতিয়ার দুজনই বক্সের চেয়ে বক্সের বাইরেই বেশি কার্যকরী। দুই ফুলব্যাকদের মধ্যে লেফটব্যাক নুরুল নাইয়ুম আক্রমণে তেমন সক্রিয় থাকেন না সাধারণত। রাইটব্যাক বিশ্বনাথের ক্রসগুলোও সবসময় পারফ্যাক্ট হয় না। যদিও ডানপ্রান্ত থেকে ক্রস করে এ মৌসুমে কয়েকটি দুর্দান্ত অ্যাসিস্ট রয়েছে তার। ২০১০ সালের আগে, এসি মিলান এবং ইন্টার মিলান ৪-৪-২ ডায়মন্ড ফরমেশন দিয়ে ইউরোপে দাপট দেখিয়েছিল। সেই ফরমেশনের সাথে অস্কারের এই ফরমেশনের তেমন মিল পাওয়া যায় না। বরং অস্কারের ৪-৪-২ ফরমেশনে অনেকটা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক কোচ অ্যালেক্স ফার্গুসনের ফ্ল্যাট ৪-৪-২ ফরমেশনের ছাপ পাওয়া যায়।

ক্রুইফ ফিলোসপি বলছে, 'মাঠে একটাই বল, সুতারাং এটি নিজের নিয়ন্ত্রনেই রাখো।' অস্কার এবং মারুফুল দুজনই যেহেতু ক্রুইয়েফের অনুসারী, তাই ম্যাচের শুরু থেকেই বল দখলের জন্য লড়াই চালিয়ে যায় তাদের শিষ্যরা। কিন্তু এক্ষেত্রে মারুফুল হকই ডমিনেট করেছেন অস্কারের বিপক্ষে। প্রথমার্ধের বেশিরভাগ সময়ে বল দখলে রেখেছেন চট্টগ্রাম আবাহনীর ফুটবলাররা। অস্কারের শিষ্যরাও কম যায়নি, তারাও শুরু থেকে হাই প্রেসিং করতে থাকে প্রতিপক্ষকে। তাদের প্রেসিংয়ের তোপে পড়ে বার বার ব্যাকপাস খেলতে বাধ্য হয়েছিল চট্টলার দলটি। তবে বসুন্ধরা কিংসের ফুটবলাররা যখন তাদের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়েছিল, তখন সেটি আবার দখল করার জন্য চট্টগ্রাম আবাহনীর প্রচেষ্টাও ছিল চোখের পড়ার মতো।

একেবারে ডিপ থেকে বিল্ডআপ শুরু করেছিল মারুফুল হকের চট্টগ্রাম আবাহনী। যেখানে গোলরক্ষক নাইম ছিলেন প্রথম প্লে মেকার। ম্যাচের শুরুতে বল বেশিরভাগ সময় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখলেও, প্রথমার্ধে তাদের বিল্ডআপটা তেমন দ্রুত হয়নি। তারা আক্রমণে উঠার আগেই প্রতিপক্ষ বসুন্ধরা কিংস নিজেদের ডিফেন্স লাইন ভালভাবে অর্গানাইজ করার পর্যাপ্ত সময় পেয়ে যেতো। যার ফলে, প্রথমার্ধে গোলশূন্য থাকতে হয় মারুফুল হকের দলকে। অন্যদিকে, অস্কার ব্রুজনের দল বসুন্ধরা কিংসের বিল্ডআপটা ছিল অনেকটা প্রেসিং নির্ভর। প্রেসিংয়ের মাধ্যমে বল ইন্টারসেপ্ট করে দ্রুত সেটি নিয়ে আক্রমণে উঠাই ছিল তাদের লক্ষ্য। ম্যাচের ৪২ মিনিটে মাঝমাঠের সার্কেলের ভিতর একটি ফাউল পায় বসুন্ধরা কিংস। সেটি থেকে জোড়ালো শট না নিয়ে আখতাম নাজারভের উদ্দেশ্যে পাস বাড়ান তপু বর্মণ। এরপর নাজারভ কলিন্দ্রেসের সাথে কিছুক্ষণ ওয়ান টু ওয়ান খেলেন। কিন্তু হঠাতই নিজের স্কিলকে কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রাম আবাহনীর কয়েকজন ফুটবলারকে বোকা বানিয়ে ডিবক্সের ভিতরে ঢুকে পড়েন কলিন্দ্রেস। সেখানে তাকে রুখতে না পেরে পেনাল্টি করে বসে চট্টগ্রাম আবাহনী। পেনাল্টি আদায় করার ক্ষেত্রে যতটা না ট্যাক্টিসের অবদান, তার চেয়ে বেশি অবদান ছিল কলিন্দ্রেসের ইন্ডিবিজ্যুয়াল ব্রিলিয়ান্সের। সেই পেনাল্টি থেকে গোল করে স্বাগতিকদের এগিয়ে দেন তাজিক ফুটবলার নাজারভ। 

বসুন্ধরা কিংসের পরের গোলটিতেও অবদান ছিল কলিন্দ্রেসের। তার ফ্রি কিক থেকেই বল জালে জড়ান আর্জেন্টাইন নিকোলাস ডেলমন্টে। বসুন্ধরা ফ্রি কিকটি পেয়েছিল চট্টগ্রাম আবাহনীর রাইটব্যাক নাসিরুল নাসিরের একটা ভুলে। প্রতিপক্ষ মিডফিল্ডার আলমগীর কবির রানার বাড়ানো একটি ভুল পাস নিয়ন্ত্রণে নিতে গিয়ে হাতে লেগে যায় তার। যার ফলে ফ্রি কিক পায় স্বাগতিক দল। 

অস্কার ব্রুজনের ট্যাক্টিসের চুড়ান্ত নিদর্শন দেখা যায় বসুন্ধরা কিংসের তৃতীয় গোলে। ম্যাচের ৫৭ মিনিটের সময় চট্টগ্রাম আবাহনীর গোলপোস্টের কয়েক গজ সামনে তাদের ডিফেন্ডার মনজুর মানিককে চার্জ করতে যান বসুন্ধরার মিডফিল্ডার ইব্রাহিম। কিন্তু ইব্রাহিমকে ছাপিয়ে মনজুর পাস বাড়ান সতীর্থ মিডফিল্ডার মানিক মোল্লার উদ্দেশ্যে। মানিক সেটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগেই পেছন থেকে দৌড়ে এসে বল ইন্টারসেপ্ট করেন বসুন্ধরার কিরগিজ ফুটবলার বখতিয়ার দুশবেখভ। প্রতিপক্ষের সীমানাতেই তাদের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে বখতিয়ার সেটি বাড়ান ডিবক্সে থাকা কলিন্দ্রেসের উদ্দেশ্যে। মাঝখানে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন মনজুর। তাতেও লাভ হলো না। বল ঠিকই খুঁজেও নিয়েছিল কলিন্দ্রেসের পা, এরপর কলিন্দ্রেস খুঁজে নিয়েছিলেন গোলের ঠিকানা। অস্কার যেভাবে প্রেসিং করে বল ইন্টারসেপ্ট করার মাধ্যমে দ্রুত আক্রমণ শানানোর চেষ্টা করেছিলেন, গোলটি তারই প্রকৃত নিদর্শন। 

নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার তখন মাত্র ২৬ মিনিট বাকী। ৩-০ গোলে পিছিয়ে পড়া একটা দলের জন্য ম্যাচটা কার্যত ওখানেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু না! চট্টগ্রাম আবাহনীর ডাগ আউটে যে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মাস্টার মাইন্ড। মারুফুল হক নামের সেই ভদ্রলোক যে তখনও ম্যাচে ফিরে আসার ব্যাপারে অবিচল। চোখে মুখে তার আত্মবিশ্বাসের ছাপ। সেই আত্মবিশ্বাসের পালে আরেকটু হাওয়া দিলেন নেপোলিয়ন বোনাপার্টে। তিনি একবার বলেছিলেন, "শুধুমাত্র বোকাদের অভিধানেই 'অসম্ভব' শব্দটা থাকে।" মারুফুল তো বোকা নন, তবে তার জন্য কেনো এটা অসম্ভব হবে? তার উপর বার্সা, রোমা, লিভারপুলের ফিরে আসার অবিশ্বাস্য গল্পগুলোও তার অজানা নয়। তাই সম্ভবনার নতুন মন্ত্রে তিনি উজ্জীবিত হলেন। উজ্জীবিত দেখাচ্ছিলো তার শিষ্যদেরও। অস্কার যখন ৩ গোলে এগিয়ে থাকার তৃপ্তিতে ভুগছেন, মারুফুল তখন প্রতিপক্ষের খুঁত বের করতে ব্যস্ত। এমনিতেই মারুফুলের সিচুয়েশন অনুযায়ী ম্যাচ রিড করার ক্ষমতা অসাধারণ। তাই বেশি সময়ও লাগলো না তার। বসুন্ধরার হাই লাইন ডিফেন্সের পেছনে প্রচুর স্পেস পড়ে থাকে। তার উপর তাদের লেফটব্যাক নুরুল নাইয়ুম কিছুটা দুর্বল। তাইতো নুরুল নাইয়ুমের প্রান্ত দিয়ে বসুন্ধরার সর্বনাশ করার ছক কষে ফেলেন মারুফুল। 

ম্যাচের ৬৪ মিনিটে মাঝমাঠ থেকে বসুন্ধরার ডিফেন্স লাইনের পেছনে এরিয়াল থ্রু বাড়ান মানিক। তখন ডানপ্রান্ত দিয়ে দুর্দান্ত রান মেইক করে বল নিয়ন্ত্রনে নেন নাসিরুল। বসুন্ধরার ডিফেন্স লাইনের পেছনে থাকা বিশাল গ্যাপের মধ্যে খুব ভালভাবে অপারেট করেন তিনি। এরপর ক্রস বাড়ান ডিবক্সের মধ্যে। গোল করার ক্ষুধায় মারুফুল তখন তার তিনজন স্ট্রাইকারকেই বক্সে সেট করেন। ফলাফলও আসে হাতে নাতে। নাসিরুলের ক্রস থেকে হেড করে প্রথম গোল পরিশোধ করেন অধিনায়ক চার্লস দিদিয়ের। 

বসুন্ধরার ডিফেন্সের ডানপ্রান্তটা কিছুটা সুরক্ষিত ছিল। আরেকটু স্পষ্ট করে বললে, চট্টগ্রাম আবাহনীর লেফটব্যাক মনির একটু দুর্বল হওয়ায় এ প্রান্ত দিয়ে তেমন আক্রমণে যায় নি সফরকারীরা। তাই এ পাশ দিয়ে তেমন পরীক্ষা দিতে হয়নি কিংসের রাইটব্যাক বিশ্বনাথকে। তবে এ প্রান্ত দিয়েই সেন্টারব্যাক তপু বর্মনের দারুণ এক পরীক্ষা নিয়েছেন চট্টগ্রাম আবাহনীর ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার নিক্সন ব্রিজোলারা। কিন্তু সেই পরীক্ষায় পাশ করেননি তপু। বরং নিক্সনকে রুখতে না পারায় ডিবক্সের ভিতরে পেনাল্টি করে বসেন এই ডিফেন্ডার। সেই পেনাল্টি থেকেই দ্বিতীয় গোল পরিশোধ করেন নিক্সন নিজেই। 

মারুফুল কতটা বুদ্ধিমান কোচ, সেটা আরেকবার প্রমাণ হয় ম্যাচের ৭৫ মিনিটে। মিডফিল্ডার মোনায়েম খানের পরিবর্তে রাইট উইঙ্গার মান্নাফ রাব্বিকে মাঠে নামান তিনি। লক্ষ্য একটাই- ডান প্রান্ত দিয়ে বসুন্ধরার দুর্বলতাকে কাজে লাগানো। মারুফুলের এই ট্যাক্টিক্যাল চেঞ্জটা যে কতোটা যৌক্তিক ছিল, ম্যাচের বাকী সময় সেটাই প্রমাণ করেছেন মান্নাফ। পরের দুটি গোলেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে এই ফুটবলারের। 

চট্টগ্রাম আবাহনীর সমতাসূচক গোলটির 'কি পাস' প্রোভাইডার ছিলেন রাইটব্যাক নাসির। নিজেদের সীমানাতে থেকে বল নিয়ে রান মেইক করেন তিনি। এসময় সতীর্থদের জন্য স্পেস ক্রিয়েট করতে তিনি প্রথমে নিজের দিকে টেনে আনেন বসুন্ধরার মিডফিল্ডার রবিউলকে। এরপর নুরুল নাইয়ুমকেও নিজের দিকে টেনে এনে বোকা বানিয়ে দুর্দান্ত এক পাস বাড়ান বসুন্ধরার ডিফেন্স লাইনের পেছনে পড়ে থাকা গ্যাপে। উইংয়ে তখন প্রস্তুত থাকা মান্নাফ দ্রুত দৌড়ে গিয়ে নিয়ন্ত্রণে নেন ওই পাস এবং ক্রস বাড়ান ডি বক্সে। সেই ক্রস থেকেই বল জালে জড়িয়ে ম্যাচে সমতা আনেন নিক্সন। এই গোলে তাদের বিল্ডআপটা এতো দ্রুত হয়েছে যে, বসুন্ধরার ফুটবলাররা যেনো কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি। 

ম্যাচে ৩-০ গোলে এগিয়ে থাকার পর ৩-৩ গোলে সমতা, অথচ বসুন্ধরা কিংসের কোচ অস্কার যেনো তখনও বুঝে উঠতে পারেননি তার দলের কোন দুর্বলতা ফাঁস হয়ে গেছে প্রতিপক্ষ দলের কোচ মারুফুলের কাছে। কোন দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে মারুফুল তার সর্বনাশ করে দিচ্ছেন, অস্কার যেনো প্রায় জবাবহীন হয়ে পড়েছিলেন। ম্যাচের ৬০ মিনিট পর্যন্ত যে প্রেসিং নির্ভর ফুটবলটা তিনি খেলেছিলেন, পরবর্তীতে সেটাও আর দেখা গেল না। এমনকি নিজেদের সীমানাতে জোনাল ডিফেন্ডিংটাও ভালভাবে করতে পারলো না তার দল। বরং ম্যাচের প্রায় অন্তিম মুহূর্তে এসে আবারো প্রায় একই জায়গা থেকে মান্নাফের ক্রস এলো ডিবক্সে। সেই ক্রস থেকে এবার চট্টগ্রাম আবাহনীর জয়সূচক গোলটি করলেন চিনেদু ম্যাথিউ। আর তাতেই লেখা হয়ে গেল ফিরে আসার এক অবিশ্বাস্য গল্প! মাত্র ৩২ মিনিটের ঝড়ে ফিনিক্স পাখির মতো উড়তে থাকা কলিন্দ্রেসের বসুন্ধরা কিংসকে মাটিতে নামিয়ে আনলো চট্টগ্রাম আবাহনী। 

এভাবে ফিরে আসার গল্পগুলো রোজ রোজ তৈরি হয় না। প্রতিপক্ষের মাঠে তো সেটা আরো বিরল। অথচ মারুফুল হকের চট্টগ্রাম আবাহনীর কল্যানে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরাও মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করলো প্রত্যাবর্তনের এক অবিশ্বাস্য গল্প!


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা