২০১৯ সালে টেস্টে সবচেয়ে বেশি রানের মালিক তিনি, কোহলি-স্মিথরা পাত্তা পাননি তার কাছে; ক্যারিয়ার গড়টা এখন স্মিথের চেয়েও বেশি!

ভাগ্য নাকী সাহসীদের পক্ষে থাকে, ভাগ্য সঙ্গী হয় বিজয়ীদের। মারনাস ল্যাবুশেনের বিপক্ষে যাওয়ার সক্ষমতা এই মূহুর্তে ভাগ্যের নেই, আর তাই আউটসাইড এজ হয়েও বলটা উইকেটকীপারকে ফাঁকি দিয়ে সীমানা দড়ি পেরিয়ে গেলো অনায়াসেই। ল্যাবুশেন ছুটলেন, ইমরান তাহিরের মতো দিগ্বিজয়ের আনন্দে নয় অবশ্যই, কিন্ত ক্যারিয়ারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরীটাকে স্মরণ করে রাখা দৌড়টার কথা ল্যাবুশেন নিশ্চয়ই মনে রাখবেন অনেক দিন। 

ভিআইপি বক্সে হাজির ছিলেন বাবা-মা, বইখাতায় ছেলেকে ডুবিয়ে না দিয়ে যারা মাঠে নিয়ে গিয়েছেন, ক্রিকেটার হবার স্বপ্নটাকে যারা গলা টিপে মেরে ফেলেননি। মায়ের উচ্ছ্বাসের ভিডিওটা নিশ্চয়ই এই জীবনে অজস্রবার দেখবেন ল্যাবুশেন, কয়েক সেকেন্ডের ওই দৃশ্যটা তাকে যতোটা তৃপ্তি দিতে পারবে, সেটার সঙ্গে কী ডাবল-ট্রিপল সেঞ্চুরীর কোন তুলনা হয়? মনে হয় না! 

ইএসপিএন ক্রিকইনফো পরিসংখ্যান ঘেঁটে বের করে ফেলেছে, কমপক্ষে বিশ ইনিংসে ব্যাটিং করেছেন, এমন ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এই মূহুর্তে ল্যাবুশেনের গড়টা এখন ক্রিকেট ইতিহাসের দ্বিতীয় সেরা! ডন ব্র‍্যাডম্যানের ঠিক পরেই তার স্থান। ব্র‍্যাডম্যানের পরে! প্রথম ক্রিকেট ব্যাটটা যেদিন কিনে দিয়েছিলেন বাবা, সেদিন কী তিনি কল্পনা করতে পেরেছিলেন, যে ব্র‍্যাডম্যানকে সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার ধরা হয়, সেই মানুষটার পরেই উচ্চারিত হবে ছেলের নাম, কয়েকটা মুহূর্তের জন্যে হলেও? 

মারনাস ল্যাবুশেন

মাস ছয়েক আগেও মারনাস ল্যাবুশেনের নাম ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে ক'জনে জানতেন, সেটা আঙুলের কড়ে গুণে বলে দেয়া যেতো। নামের উচ্চারণটা একটু গোলমেলে, প্রথমবার শুনলে কারো মুখ থেকে 'এক কোন নতুন পাগল হে বাপু!' টাইপের অভিব্যক্তি আসাটাও অসম্ভব কিছু ছিল না। অ্যাশেজের আগে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট খেলেছেন চারটা, বলার মতো কিছুই করতে পারেননি। না ব্যাট হাতে, না বোলিঙে। চারটা টেস্টে মাত্র ৪৬ রান করা কোন ক্রিকেটারকে মনে না রাখাটাও অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না।

ক্রিকেট ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছিলেন অন্যরকম একটা কারণে। সবশেষ অ্যাশেজের ঘটনা সেটা, লর্ডস টেস্টে জোফরা আর্চারের বাউন্সারে নাকাল হলেন দুর্দান্ত ফর্মে থাকা স্মিথ, আহত হয়ে ছাড়লেন মাঠ। ফিজিও জানিয়ে দিলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট হাতে নামতে পারবেন না অস্ট্রেলিয়ার সেরা ব্যাটসম্যান! ম্যাচ রেফারি বিশেষ অনুমোদন দিলেন ল্যাবুশেনকে, স্মিথের বদলি ক্রিকেটার হিসেবে। রেকর্ড গড়ে ফেললেন ল্যাবুশেন, টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম বদলি ক্রিকেটার তিনিই!

লর্ডসের গল্পটা শেষ করি। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং করতে নেমেই আর্চারের দানবীয় গতির সামনে পড়লেন ল্যাবুশেন, বাউন্সার আঘাত করলো তার হেলমেটে। ল্যাবুশেন হার মানলেন না, দাঁতে দাঁত চেপে টিকে রইলেন, বাঁচিয়ে রাখলেন অস্ট্রেলিয়ার আশা। দেড় সেশন টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমে দল যখন হাবুডুবু খাচ্ছে, তখন শক্ত হাতে হাল ধরেছেন ল্যাবুশেন। লর্ডস টেস্টের শেষ দিনে অস্ট্রেলিয়া যে ড্র করতে পেরেছিল, সেখানে ল্যাবুশেনের কৃতিত্বটা সবচেয়ে বেশি।

সেই থেকে শুরু। স্মিথের অবর্তমানে রানের ফোয়ারা অব্যহত রইলো তার ব্যাটে, হেডিংলির কঠিণ উইকেটে দুই ইনিংসেই হাঁকালেন হাফসেঞ্চুরী। স্মিথ ফিরেছেন দলে, ল্যাবুশেনের ছিটকে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্ত এমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পরে কার সাধ্যি তাকে দল থেকে বাদ দেয়? অ্যাশেজের বাকীটা সময়, পাকিস্তান সিরিজ, নিউজিল্যান্ড সিরিজ- ল্যাবুশেনের ব্যাট হাসতে শুরু করলো প্রতিনিয়ত। সেই হাসির সামনে ম্লান হয়ে গেল বাকী সবাই, এমনকী দোর্দণ্ড প্রতাপশালী স্টিভেন স্মিথও! 

২০১৯ সালে টেস্টে সবচেয়ে বেশি রানের মালিক ল্যাবুশেন

২০১৯ সালে টেস্টে সবচেয়ে বেশি রানের মালিক তিনি, কোহলি-স্মিথরা পাত্তা পাননি তার কাছে; ক্যারিয়ার গড়টা এখন স্মিথের চেয়েও বেশি! ১৪ টেস্টে বরাবর ১৪০০ রানের মালিক এখন ল্যাবুশেন, চারটা সেঞ্চুরী আর সাত হাফসেঞ্চুরী আছে নামের পাশে। বড় ইনিংস খেলতে জুড়ি নেই, আজকের ডাবলটা তো আছেই, এর আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলেছেন ১৮৫ রানের ইনিংসও। বোলারদের কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছেন কয়েক মাসের ব্যবধানে, ড্রেসিং রুমে দলের ভরসার অন্যতম আশ্রয়স্থল। 

ল্যাবুশেনের ব্যাটিংটা ভালোভাবে খেয়াল করলে যে ব্যাপারটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়বে, সেটা হচ্ছে তার উত্তুঙ্গ আত্মবিশ্বাস। নিজের শক্তির ওপর ভীষণ কনফিডেন্ট তিনি। ভালো বলকে প্রাপ্য সম্মান দিচ্ছেন, বাজে বল পেলেই শায়েস্তা করছেন, চোখ ধাঁধানো কভার ড্রাইভে মুগ্ধ করছেন দর্শককে। ক্রিকেটীয় সৌন্দর্য্যের পসরা হয়তো তার ব্যাটে দেখা যায় না, শিল্পী নন ল্যাবুশেন। কিন্ত পরিশ্রমী এক শ্রমিকের মতোই তিনি ইনিংসটা মেরামত করে যান, দলকে তুলে নেন রান পাহাড়ের চূড়ায়। ল্যাবুশেনের সামনে স্বয়ং স্টিভেন স্মিথকে ফিকে মনে হয়, বাইশ গজে এমনই প্রভাবশালী তার বিচরণ! 

এভারেস্ট ছোঁয়ার আশা দেখিয়ে শেষমেশ গারো পাহাড়েও উঠতে পারেনি, এমন অজস্র প্রতিভার দেখা পেয়েছে ক্রিকেট। ল্যাবুশেনের ব্যাপারেও কোন জাজমেন্টে যাওয়াটা উচিত হবে না এখনই। দুর্দান্ত খেলছেন, বোলারদের কোন সুযোগ দিচ্ছেন না, আলোর রোশনাইয়ের সবটুকুই তিনি কেড়ে নিচ্ছেন নিজের দিকে। তরুণ এক ক্রিকেটারের জন্যে এটা বিশাল অর্জন, সন্দেহ নেই। কিন্ত স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা তো কঠিণ। নিজের রাজ্যপাট ল্যাবুশেন কতটা গুছিয়ে নিতে পারেন, সাম্রাজ্য কতদূর বিস্তৃত করতে পারেন, সেটা সময়ই বলে দেবে। আপাতত মুগ্ধ চোখে তার ব্যাটিংটাই নাহয় উপভোগ করা যাক...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা