হাসান কিংবা কাঁদান, মাহমুদউল্লাহরা তো এই লাল সবুজের প্রতিনিধিত্বই করেন। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে তুলে ধরেন। 

২০১১ সালের আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপে ঘরের মাঠে ব্যর্থ হওয়া বাংলাদেশের ভাণ্ডারেও গর্ব করার মতো একটা অর্জন যুক্ত হয়েছিল। তখনকার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে পুঁচকে দল হিসেবে ধরা হতো। তাই বিশ্বকাপের মতো আসরে ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলকে হারানোর চিন্তাও করা যেতোনা। সম্মাজনক পরাজয়ই যেখানে মুখ্য বিষয় ছিল, সেখানে বাংলাদেশ ঘটিয়েছিল অঘটন। জোনাথান ট্রট, পল কলিংউডদের নিয়ে গড়া ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ক্রিকেট বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল টাইগাররা। অথচ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ম্যাচটি জিততে বাংলাদেশকে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে চলে যেতে হয়েছিল। 

শফিউল-রুবেলদের বোলিং তান্ডবে শুরুতে ব্যাট করতে নেমে ২২৫ রানেই গুটিয়ে যায় ইংলিশরা। ম্যাচ শুরুর আগে সম্মাজনক পরাজয়ের আশা করা মানুষগুলো তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল ইংলিশ বধের! জবাবে খেলতে নেমে তামিম-ইমরুলের ব্যাটে শুরুটা দারুণ হয়েছিল বাংলাদেশের। কিন্তু হঠাতই ছন্দপতন ঘটে। ১৫৫ রানে চতুর্থ উইকেট হারানো বাংলাদেশ, ১৬৯ রানেই হারায় ৮ উইকেট। তখন চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরি স্টেডিয়ামের গ্যালারিজুড়ে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা!

কিছুক্ষণ আগে চার ছয়ের আনন্দে উল্লাস করা মানুষগুলোর কেউ কেউ তখন কাঁদছিলো। আবার কেউ কেউ মোনাজাত ধরে আল্লাহ্‌কে ডাকছিলো। বাংলাদেশের ইনিংসে ধ্বস নামিয়ে ইংলিশরা যখন জয়ের সুবাতাস নিচ্ছিলো, তখনই ২২ গজে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন দুই টাইগার। বাঘের গর্জন দিয়ে ইংল্যান্ডের তাবু থেকে ছিনিয়ে এনেছিলেন জয়। শফিউলের সাথে ৫৮ রানের নিরবিচ্ছিন্ন জুটিতে বাংলাদেশকে জয়ের হাসি হাসিয়েছিলেন মাহমুদউল্লাহ। 

সেইবারই শেষ নয়, এরপর আরো কত বার তিনি বোলারদের সঙ্গী করে বাংলাদেশকে নিয়ে গিয়েছেন নিরাপদ সংগ্রহের দিকে কিংবা পৌঁছে দিয়েছেন জয়ের বন্দরে। তখনও হয়তো তার নামের পাশে সাইল্যান্ট কিলার তকমাটা লাগেনি। কিন্তু মাহমুদউল্লাহ নিয়মিতই বাংলাদেশের ধ্বসে পড়া ইনিংস মেরামত করে যেতেন নিরবে।

২০১৫ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ তো স্বপ্নের মতো কেটেছিল তার। তিনি বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বপ্রথম সেঞ্চুরিয়ান হয়েছিলেন সেই আসরেই। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে তার সেই রেকর্ড গড়া ইনিংসের কল্যাণেই বাংলাদেশ গড়েছিল নতুন ইতিহাস। আবারো ইংলিশ বধ করে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়াটার ফাইনালে উঠেছিল টাইগার বাহিনী। 

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ

বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের অধারাবাহিকতার জন্য অনেকে তাদেরকে 'ওয়ান ম্যাচ ওয়ান্ডার' হিসেবে আখ্যায়িত করতো তখন। কিন্তু মাহমুদউল্লাহ তা ভুল প্রমাণ করলেন। পরের ম্যাচেও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হাঁকিয়েছেন ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরি। আগের ৪ বিশ্বকাপ খেলে যেখানে সেঞ্চুরিশূন্য ছিল বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানরা, সেখানে এক বিশ্বকাপেই মাহমুদউল্লাহর জোড়া সেঞ্চুরি! সেইবার মাহমুদউল্লাহর মাধ্যমেই বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের শ্রেষ্ঠত্ব ফুটে উঠেছিল। 

বিশ্বকাপের পরে পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ। সেই সিরিজগুলোতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল মাহমুদউল্লাহর। তখন থেকেই দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। 

২০১৮ সালে শ্রীলংকায় অনুষ্ঠিত নিদাহাস ট্রফিতে তো এক অবাক করা কান্ড ঘটিয়েছিলেন তিনি। ত্রিদেশীয় এই টি-২০ টুর্নামেন্টে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে শ্রীলঙ্কার মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। ম্যাচটি ছিল অলিখিত সেমিফাইনাল। কারণ,  টুর্নামেন্টের অন্য দল ভারত আগেই ফাইনাল নিশ্চিত করে ফেলেছিল। তাই বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচের বিজয়ী দলই ফাইনালে তাদের সঙ্গী হওয়ার কথা ছিল। 

এমন অবস্থায় শ্রীলঙ্কার দেওয়া ১৬০ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ জিতেছিল নাটকীয়ভাবে! অনেক উত্তেজনা আর শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল ম্যাচে। শেষ ৪ বল থেকে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ১২ রান। কিন্তু শেষ ওভারে ইসুরু উদানার করা তৃতীয় ডেলিভারিটি ওয়াইড হওয়া সত্ত্বেও আম্পায়ার নাখোশ করে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিটি বলই যখন গুরুত্বপূর্ণ,  তখন আম্পায়ারের এরকম বাজে সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্ট। অধিনায়ক সাকিব আল হাসান ম্যাচ বয়কট করতে চেয়েছিলেন, মাহমুদউল্লাহকে মাঠের বাহিরে চলে আসতে বলেছিলেন।

কিন্তু মাহমুদউল্লাহ এক্ষেত্রে ভদ্রতার পরিচয় দিয়েছিলেন, মাথা ঠান্ডা রেখেছিলেন। ম্যাচ বয়কট না করে তিনি চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন ৩ বলে ১২ রানের কঠিন সমীকরণ মেলানোর। সেই চ্যালেঞ্জে তিনি জিতেছেন বীরের বেশে, তাও আবার ১ বল হাতে রেখেই। উদানার পরবর্তী ২ বলে পরপর ২টি ছয় হাঁকিয়ে সেইবার বাংলাদেশকে ফাইনালে তুলেছেন এই সাইল্যান্ট কিলার। 

মাহমুদউল্লাহ বাংলাদেশকে যেমন হাসিয়েছেন, তেমনি কয়েকবার কাঁদিয়েছেনও। ২০১২ সালে এশিয়া কাপের ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২ বলে ৩ রানের সমীকরণ না মেলাতে পারার ব্যর্থতা রয়েছে তার কাঁধে। এখানেই শেষ নয়, ২০১৬ সালের টি-২০ বিশ্বকাপে স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে ২ বলে ২ রানের সহজ সমীকরণের ম্যাচটিও তিনি জেতাতে পারেননি। 

হাসান কিংবা কাঁদান, মাহমুদউল্লাহরাই তো এই লাল সবুজের প্রতিনিধিত্বই করেন। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে তুলে ধরেন। তাই তারা গালিগালাজ নয় বরং আমাদের থেকে একটু ভালবাসা ডিজার্ভ করেন।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা