এপ্রিলের আটাশ তারিখ বিকেল নাগাদ ফোনটা এলো। গিলবার্তো তখন নিজের চেম্বারে। তাকে বলা হলো, মিয়ামিতে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে তার পরিবারের সদস্যরা। ওরা যে গাড়ির ভেতরে ছিল, সেটাকে আরেকটা গাড়ি ধাক্কা দিয়ে একদম দুমড়ে মুচড়ে ফেলেছে।

ছবিতে যে মানুষটাকে দেখতে পাচ্ছেন, তার নাম গিলবার্তো মার্টিনেজ। ভদ্রলোক পেশায় উকিল, জাতীয়তায় মেক্সিকান। বিশ্বকাপ দেখতে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন বছর দেড়েক আগে। ছবিটা তখনই তোলা। গলায় চারটা আইডি কার্ড আর পকেটে চারটা টিকেট নিয়ে ঘুরেছেন তিনি। একাই স্টেডিয়ামে গিয়েছেন, হোটেলে ফিরেছেন একা, এর মাঝে রাস্তায় গলা ফাটিয়েছেন মেক্সিকোর হয়ে। কিন্ত মানুষটার একা থাকার কথা ছিল না। স্ত্রী ভেরোনিকা আর দুই ছেলেমেয়ে ডিয়াগো-মিয়ারও থাকার কথা ছিল তার সঙ্গে। কিন্ত ওদের কেউই আসতে পারেনি তার সঙ্গে, বিশ্বকাপ শুরু হবার মাস দুয়েক আগে, এপ্রিলের এক অলস দুপুরে ভালোবাসার এই মানুষগুলোকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছেন গিলবার্তো!

স্ত্রী আর দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে ভীষণ সুখের একটা সংসার ছিল গিলবার্তো মার্টিনেজের। অনেকদিন দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় না, সামনে বিশ্বকাপও আসছে; এই দুটোকে একসঙ্গে মিলিয়ে গিলবার্তো আর ভেরোনিকা পরিকল্পনা করেছিলেন, এবারের বিশ্বকাপ দেখতে রাশিয়ায় যাবেন সবাই মিলে। রথ দেখাও হলো, কলা বেচাও হলো।

গিলবার্তো আর ভেরোনিকা দুজনেই ফুটবল অন্তপ্রাণ। ওদের আট বছরের ছেলে ডিয়াগোও হয়েছিল একদম ওদেরই মতো। যদিও মেক্সিকান কেউ নয়, তার প্রিয় খেলোয়াড় ছিলেন নেইমার জুনিয়র। ডিয়াগো ফুটবলার হতে চাইতো, ওর আইডল নেইমারের মতো ফুটবল পায়ে মাঠে জাদু দেখাতে চাইতো।

টিকেট কাটা হয়ে গিয়েছিল। অনলাইনে বুকিং দেয়া হয়েছিল হোটেলেও। জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে মেক্সিকো থেকে বিমানে চড়ার কথা গিলবার্তো ফ্যামেলির। রাশিয়ায় যাবার আগে ভেরোনিকা মিয়ামিতে গেলেন ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে, ডিয়াগো আর মিয়া'ও গেল মায়ের সঙ্গে। দেশে বসে জোগাড়যন্ত করতে লাগলেন গিলবার্তো।

স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে গিলবার্তো

এপ্রিলের আটাশ তারিখ বিকেল নাগাদ ফোনটা এলো। গিলবার্তো তখন নিজের চেম্বারে। তাকে বলা হলো, মিয়ামিতে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে তার পরিবারের সদস্যরা। ওরা যে গাড়ির ভেতরে ছিল, সেটাকে আরেকটা গাড়ি ধাক্কা দিয়ে একদম দুমড়ে মুচড়ে ফেলেছে। গাড়িতে চারজন ছিল, দুজন প্রাপ্তবয়স্ক, দুজন শিশু। কারোরই বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই খুব একটা।

গিলবার্তোর গোটা দুনিয়াটা টলে উঠলো। আমেরিকার বিমানে ওঠার আগেই তিনি জেনে গেলেন, ভেরোনিকা-ডিয়াগো-মিয়া কেউই বেঁচে নেই, সবাই স্পটডেড! সঙ্গে মারা গেছে গাড়িতে থাকা ভেরোনিকার ভাইও। হাসপাতালের মর্গে গিয়ে ফ্রিজের ভেতরে রাখা ওদের নিথর দেহগুলোই শুধু পেলেন তিনি।

প্রিয়জনকে হারিয়ে ফেলাটা মানুষকে কতটা কষ্ট দিতে পারে, সেটা হয়তো গিলবার্তো মার্টিনেজের চেয়ে ভালো খুব কম মানুষই জানেন। এক মূহুর্তের ব্যবধানে গোটা পরিবারকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন ভদ্রলোক। স্ত্রীর শোক তো সয়ে নিতে পারতেন, কিন্ত বাড়িতে ঢুকলেই কানে বাজতো ছেলে-মেয়ে দুটোর আওয়াজ। যেন আড়াল থেকে এক্ষুনি ছুটে এসে তার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়বে। লনে এসে দাঁড়ালেই যেন ডিয়াগোকে দেখতে পেতেন তিনি, একটা ফুটবল নিয়ে ড্রিবলিং করছে, তার দিকে তাকিয়ে হাসছে...

একটা মাস কেটে গেল, বিশ্বকাপের বাদ্য বেজে উঠি উঠি করছে তখন। গিলবার্তো অবশ্য সেসব ভুলেই গিয়েছিলেন প্রায়। তীব্র যন্ত্রণার ভার আর সইতে পারছিলেন না গিলবার্তো, শরণাপন্ন হলেন মনোবিদের। তাকে খুলে বললেন সব কিছু। শুনে মনোবিদ তাকে পরামর্শ দিলেন, রাশিয়ায় চলে যেতে। দোটানায় ভুগতে ভুগতে অবশেষে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললেন গিলবার্তো, চড়ে বসলেন রাশিয়ার বিমানে।

২০১৮ বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে প্রথম ম্যাচটায় যেদিন জার্মানীকে হারিয়ে দিলো মেক্সিকো, গ্যালারীতে বসে সেদিন অঝোরে কেঁদেছেন গিলবার্তো। বারবার মনে পড়ছিল, পরিবারের বাকীরা থাকলে তাদের নিয়ে কত আনন্দই না করতে পারতেন আজ! গলায় চারটা অ্যাক্রিডেশন কার্ড ঝুলিয়ে রেখেছিলেন তিনি, ভেরোনিকা, ডিয়াগো আর মিয়ারা তার সঙ্গে ছিলেন সেই কার্ডগুলোর মাঝেই। ওদের তিনজনের নাম খোদাই করা টিশার্ট বানিয়ে নিয়ে এসেছেন তিনি, সেগুলো পরেই গিয়েছিলেন স্টেডিয়ামে। ম্যাচশেষে গিলবার্তোর কান্না ছুঁয়ে গেছে গ্যালারীতে তার আশেপাশে থাকা মানুষগুলোকেও। তাকে স্বান্তনা জানানোর ভাষা ছিল না কারো কাছে।

ছেলে ডিয়াগোর টিশার্ট বুকে জড়িয়েই খেলা দেখেছেন গিলবার্তো

সেদিনের খেলা শেষে রাত পর্যন্ত রাস্তায় চিৎকার করে শ্লোগান দিয়েছেন মেক্সিকোর জন্যে। রাতে হোটেলরুমে এসে মোবাইল খুলে দেখলেন, একটা মেসেজ এসেছে। সেখানে লেখা- "দিস ওয়ান ইজ ফর ইওর ফ্যামেলি..." মেসেজটা তাকে পাঠিয়েছিলেন মেক্সিকোর গোলরক্ষক গিলের্মো ওচোয়া। গিলবার্তোর ঘটনাটা তো মেক্সিকোর অনেকেই জানে এখন, ওচোয়াও হয়তো জেনেছিলেন কারো কাছে।

কোস্টারিকার বিরুদ্ধে ব্রাজিলের ম্যাচটা দেখতে গিয়েছিলেন গিলবার্তো। তিনি ব্রাজিলের ভক্ত নন, কিন্ত এই ম্যাচের টিকেট নিয়েছিলেন ছেলের পীড়াপীড়িতে। ডিয়াগো নেইমারের অন্ধভক্ত ছিল, প্রিয় ফুটবলারকে একবার নিজের চোখে মাঠে খেলতে দেখতে চেয়েছিল ছোট্ট ছেলেটা। ঈশ্বর নাহয় ডিয়াগোকে কেড়ে নিয়েছেন ওর স্বপ্নটা অপূর্ণ রেখেই, বাবা হয়ে গিলবার্তো তো ম্যাচটা না দেখে থাকতে পারেন না! গলায় চারটা অ্যাক্রিডেশন কার্ড ঝুলিয়ে ছেলের হয়েই স্টেডিয়ামে গিয়েছিলেন গিলবার্তো।

ম্যাচের শেষ মূহুর্তে গোল করে ব্রাজিলের জয় নিশ্চিত করেছিলেন নেইমার। ম্যাচশেষে মাঠের ভেতরেই মাথা নীচু করে কেঁদেছেন ব্রাজিলিয়ান এই ফুটবলার। কেন, সেটা তিনিই ভালো জানেন। নেইমার হয়তো দেখেননি, স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তাদের জয়ে চোখের জল ঝরাচ্ছেন একজন বাবা, নিজের সন্তানকে যিনি হারিয়ে ফেলেছেন অকালে! নেইমার জানবেন না হয়তো, তাদের একটা জয়ে অসীম ভালোবাসা আর প্রচণ্ড কষ্ট কিভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে সেদিন!

ফুটবল মাঝে মাঝে জীবনের চেয়েও বড়, এই ধ্রুব সত্যি কথাটা গিলবার্তো মার্টিনেজের মতো মানুষগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন বারবার...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা