তিনি ছিলেন তুরস্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবলার। কিন্ত সেই হাকান সুকুর এখন আমেরিকায় ট্যাক্সি চালিয়ে বেঁচে আছেন কোনমতে! কী করে এই দুরবস্থার শিকার হলেন তিনি? সুকুর কিন্ত অভিযোগের আঙুল তুলেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বিরুদ্ধে!

তুরস্কে একটি ছবি খুব ভাইরাল হয়েছিল। তুরস্কের ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হাকান সুকুরের বিয়ের ছবি। যে ছবি বিখ্যাত হওয়ার কারণ, সেদিন সুকুরের সাথে একই ফ্রেমে বন্দী হয়েছিলেন তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডানপন্থী নেতা রিসেফ এরদোয়ান এবং তার ভিন্ন মতাদর্শী ইসলামিক স্কলার ফেথুল্লাহ গুলেন। বিয়ে একজন মানুষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কিন্তু সুকুরের জন্য সেই বিয়ে পরবর্তীতে সুখকর হয়নি। ১৯৯৯ সালে তুরস্কের ভয়াবহ ভুমিকম্পে তিনি তার প্রথম স্ত্রীকে হারিয়েছিলেন। 

২০০২ সালের বিশ্বকাপে প্লে অফ ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার মুখোমুখি হয়েছিল তুরস্ক। দর্শকদের অনেকেই হয়তো নিজেদের আসন পেতে বসেননি তখনও। কিছু বুঝে উঠার আগেই স্বাগতিক দর্শকদের হতাশ করে গোল খেয়ে বসলো দক্ষিণ কোরিয়া। ম্যাচ শুরু হওয়ার মাত্র ১০.৮ সেকেন্ডের মধ্যেই স্ট্রাইকার হাকান সুকুর এগিয়ে দিলেন তুরস্ককে। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুততম গোল হিসেবে আজও অটুট রয়েছে তার সেই রেকর্ডটি।

বিশ্ববাসী হয়তো এই গোলের জন্যই আরো অনেকদিন মনে রাখবে সুকুরকে, কিন্তু তুরস্কের মানুষ কি কোন দিন ভুলতে পারবে তাকে? তিনি যে তুরস্কের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। শুধু তাই নয়, তুরস্কের অন্যতম সেরা ক্লাব গ্যালাতাসারের ইতিহাসের সেরা ফুটবলারও যে তিনি। রাইভাল ক্লাবের লিজেন্ড হলেও বেসিকতাসের সমর্থকরাও তাকে স্মরণ করেন শ্রদ্ধার সঙ্গে। 

২০০২ সালের বিশ্বকাপে তুরস্ককে সেমিফাইনালে উঠানোর নায়ক হাকান সুকুর ক্যারিয়ারের ইতি টানেন ২০০৮ সালে। এরপরেই যোগ দেন রাজনীতিতে।  তুরস্কে তখন থেকেই তুমুল জনপ্রিয় ছিল এরদোয়ানের দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট। এই দলের হয়েই ২০১১ সালের সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন সুকুর। কিন্তু কে জানতো পরবর্তীতে এই দলটিই তার জীবনের জন্য কাল হয়ে আসবে! এরদোয়ানের ভয়াল থাবায় তাকে সর্বহারা হতে হবে! 

হাকান সুকুরের জীবনটা বিষিয়ে তুলেছেন এরদোয়ান

এরদোয়ানের দলে যোগ দিলেও নিজের ধর্মের প্রতি আলাদা একটা টান ছিল সুকুরের। তাই তিনি বিখ্যাত ইসলামিক স্কলার ফেথুল্লাহ গুলেনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। সরকারের ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ডগুলো তুরস্কের জনগণের কাছে তুলে ধরতেন বলে গুলেনের সাথে শত্রুতা তৈরি হয় এরদোয়ানের। তাই সুকুরের সাথে গুলেনের যোগাযোগের বিষয়টি ভালভাবে নেননি এরদোয়ান। এমনকি মতানৈক্যর কারণে ২০১৩ সালে এরদোয়ানের দল ত্যাগ করেন সুকুর। দল ত্যাগ করলেও স্বতন্ত্র হিসেবে সংসদ সদস্য পদে বহাল ছিলেন তিনি। এরপর এরদোয়ানের কিছু কার্যক্রমের সরাসরি প্রতিবাদ করতে থাকেন। যার কারণে প্রেসিডেন্টের রোষানলে পড়েন তিনি। রাষ্ট্র বিদ্রোহ এবং প্রেসিডেন্টকে অপমান করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। যে কারণে তিনি দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। 

সরকারী আইনজীবীরা তাকে সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলের সদস্য হিসেবে আখ্যায়িত করার পর ২০১৬ সালে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। শুধু তাই নয়, কারাবন্দী করা হয় তার বাবাকে। তার ব্যবসা, সম্পত্তি সব জব্দ করে এরদোয়ান প্রশাসন। সুকুর দাবি করেন, "আমার আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এরদোয়ান সব কেড়ে নিয়েছে। এমনকি স্বাধীনতা, কথা বলা এবং কাজ করার অধিকারটুকুও। সরকার আমার তুরস্কের সব বাড়ি, ব্যবসা এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করেছে। তাই বাধ্য হয়েই আমি বিদেশে পাড়ি জমিয়েছি।"

তুরস্কের ফিরে গেলেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে তাকে। আটক থাকা বাবার সাথে হয়তো আর কখনোই দেখা হবে না তার। বর্তমানে দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে দুঃখ কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন দূর প্রবাসে, আমেরিকায়। একসময়ের মাঠ কাঁপানো ফুটবলার বর্তমানে জীবিকা নির্বাহ করছেন ট্যাক্সি চালিয়ে।  

হাকান সুকুরের এই পরিণতি আমাদের মন খারাপ করে দেয়। একটা রাষ্ট্রের প্রধান যদি স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতার হন, তার রোষানলে পড়ে দেশের সবচেয়ে বড় ফুটবল তারকার জীবনটাও যে বেসামাল হয়ে যেতে পারে, তারই একটা নজির স্থাপন করে দিলো হাকান সুকুরের এই ঘটনাটা...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা