পরিপূর্ণ একটা ক্যারিয়ার তার, বিশ্বজয়ের দারুণ তৃপ্তি নিয়ে ক্যারিয়ার শেষ করতে পারছেন- এরচেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে? বিদায়বেলায় আমাদের তরফ থেকে একটা ধন্যবাদ তো তার প্রাপ্য, তাই না?

গোল করাটা তার কাছে ছিল নেশার মতো। একদম শৈশবেই বুঝে গিয়েছিলেন, ফুটবল হচ্ছে গোলের খেলা, গোলটাই এখানে সবকিছু। আর তাই স্ট্রাইকার হতে চাইলেন, হয়েও গেলেন। জীবনটা তার রোলার কোস্টার রাইড ছিল না, তবে উত্থান আর পতন- দুটোই দেখেছেন, সয়েছেন তিনি। গতকাল যখন পেশাদার ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটা খেলে বুটজোড়া তুলে রাখলেন ডেভিড ভিয়া, তখন পেছনে তাকালে হয়তো দেখতে পেতেন, বুড়ো বয়সে নাতি নাতনীর সঙ্গে বসে গল্প করার প্রচুর রসদ জমে গেছে তার ভাণ্ডারে।

ফুটবল তাকে তারকা বানিয়েছে, অর্থ-বিত্ত-খ্যাতি এনে দিয়েছে, অথচ তার তো ফুটবলার হবারই কথা ছিল না! মাত্র চার বছর বয়সে ডান পায়ের ফিবুলায় আঘাত পেয়েছিলেন, তিনি যে হাঁটতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তাও দিতে পারেননি তখন ডাক্তারেরা। সেই ভিয়া হাঁটলেন, দৌড়ালেন, আয়তাকার সবুজ মাঠের বুকে ফুল ফুটেছে তার পায়ের জাদুকরী স্পর্শে- ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে করলে পুরো জার্নিটাই তো ডেভিড ভিয়ার কাছে অবাস্তব মনে হবার কথা!

বাবা ছিলেন কয়লা খনির শ্রমিক, আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না, নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। হেলথ ইন্স্যুরেন্সটা না থাকলে তো পায়ের চিকিৎসাটাই হতো না তার। সেই পরিবারের ছেলে হয়ে ফুটবলার হবার স্বপ্ন দেখাটা বিলাসিতাই বটে। তবে ছোট্ট ডেভিডের ইচ্ছেটা বাবা-মা ধরতে পেরেছিলেন ভালোভাবেই, আর তাই অমত থাকলেও ছেলেকে বাধা দেননি, তাকে ইচ্ছেপূরণের পথে হাঁটতে দিয়েছেন, সংসারের খরচ কমিয়ে ডেভিডকে বুট কিনে দিয়েছেন, ইউথ অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করেছেন।

বার্সেলোনার হয়ে ভিয়া জিতেছেন চ্যাম্পিয়ন্স লীগ

পথটা কণ্টকাকীর্ন ছিল ভীষণ, সহজে কী আর কিছু মেলে জীবনে? ফুটবলটা ছেড়ে দেবেন ভেবেছিলেন একবার, বয়স তখন তেরো-চৌদ্দ, কৈশরের আবেগ গায়ে মাখা। ইউথ অ্যাকাডেমির কোচের সঙ্গে খুব ঝামেলা হলো তার, মেজাজ খারাপ করে ভিয়া ঠিকই করে রেখেছিলেন, এসব খেলা-টেলায় আর থাকবেনই না, নয়টা-পাঁচটার নির্ঝঞ্ঝাট চাকরিটাই তার জন্যে বুঝি ভালো। কিন্ত ভাগ্যদেবী যার অদৃষ্টে ফুটবলার হওয়াটা লিখে রেখেছেন, তিনি কি ফুটবল ছাড়তে পারেন?

ভিয়া তাই ফুটবলার হলেন। স্পোর্টিং গিজন থেকে রিয়াল জারাগোজা হয়ে ভ্যালেন্সিয়ায় গেলেন, তারকা হলেন, সেখান থেকে বার্সেলোনা, তার স্বপ্নের ক্লাব, বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের একজন তিনি তখন। তারপর অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদ, পড়ন্তবেলায় যাযাবর হয়ে খেলে বেড়িয়েছেন আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, এমনকি জাপানেও! গোল করলেন, করালেন, ম্যাচ জেতালেন দলকে। ইউরো, বিশ্বকাপ- সব আসরেই জাতীয় দলের হয়ে করলেন গোল, হলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। স্পেনের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোতে মিশে রইল তার অবদান, রেকর্ডবুকে সারা জীবনের জন্যে জায়গা করে নিলো তার নামটা।

ভিয়ার সঙ্গে আমাদের পরিচয়টা অনেক আগে, তখন নতুন নতুন ইউরোপিয়ান ফুটবল ফলো করতে শুরু করেছি, রোনালদিনহো নামের ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো এক তরুণের পায়ের যাদুতে আমরা তখন মন্ত্রমুগ্ধ। কাকা-রোনালদো-মেসিদের ভীড়ে ডেভিড ভিয়া পার্শ্বচরিত্র; পরিচিত, তবে হৃদয়ের রাডারের অনেক বাইরে।

দারুণ অবদান রেখেছিলেন স্পেনের ইউরো এবং বিশ্বকাপ জয়ে

সেখানে তিনি জায়গা করে নিলেন ২০০৮ ইউরো দিয়ে। ফুটবলে স্পেনের নবজাগরণের সূচনা হলো তার পায়ে, ইউরোজয়ী সেই দলে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন ভিয়া। তারপর বিশ্বকাপ, গ্রুপ পর্ব আর নকআউট রাউন্ডের অর্ধেকটা স্পেন পার হলো তার কাঁধে ভর করেই। শেষ দুটো ম্যাচে গোল পাননি, তবুও সিলভার বুট তার পায়ে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতলো স্পেন, মিউনিখের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে সোনালী ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরলেন ইকার ক্যাসিয়াস, সেটা হাতে নিয়ে চুমু খাবার সময় ‘সব পেয়ে গেছি’ টাইপের একটা তৃপ্তি নিশ্চয়ই কাজ করছিলো ভিয়ার মনে।

আপাদমস্ত ভদ্রলোক হিসেবেই জীবনটা কাটিয়েছেন, অহেতুক বিতর্কের খোরাক হবার বাসনা তার হয়নি কখনও। নিজের কৈশরের ভালোবাসার মানুষটাকে বিয়ে করে সংসার পেতেছেন, তারকাখ্যাতি তাকে অন্য মানুষে রূপান্তরিত করতে পারেনি। ফুটবলার হিসেবে মেসি-রোনালদোর মতো প্রতিভাবান তিনি ছিলেন না, ইব্রাহিমোভিচের মতো আলোচনার খোরাক হতেও চাননি কখনও। বিশ্বকাপ-ইউরো বা স্পেনের ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হবার চেয়েও বেশি আনন্দ তাকে দিতো দলের জয়ে অবদান রাখতে পারাটা। টিমম্যান বলতে যা বোঝায়, ভিলা ঠিক সেটাই ছিলেন।

ইউরো জিতেছেন, বিশ্বকাপ জিতেছেন, বার্সেলোনার জার্সিতে স্প্যানিশ লীগ, চ্যাম্পিয়ন্স লীগ- সবকিছুই জেতা হয়েছে তার। তবুও তিনি যাযাবরের মতো ক্যারিয়ারটাকে জিইয়ে রেখে বিশ্বের নানা প্রান্তে খেলে বেড়িয়েছেন শুধু খেলাটাকে ভালোবাসেন বলেই। ভিয়া নিজেও জানতেন, এই দিনটা আসবে কখনও, সেটাকে বিলম্বিত করার একটা চেষ্টা নিজের অজান্তেই হয়তো করেছেন তিনি। কিন্ত এই আটত্রিশ বছর বয়সে এসে বিদায় বলাটাকেই ভবিতব্য ভেবেছেন তিনি। পরিপূর্ণ একটা ক্যারিয়ার তার, বিশ্বজয়ের দারুণ তৃপ্তি নিয়ে ক্যারিয়ার শেষ করতে পারছেন- এরচেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে? বিদায়বেলায় আমাদের তরফ থেকে একটা ধন্যবাদ তো তার প্রাপ্য, তাই না?

থ্যাংক ইউ ডেভিড, থ্যাংকস ফর দ্য মেমোরিজ!


ট্যাগঃ

শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা