২৩ বছর বয়সে মেসি ২টি ব্যালন ডি'অর জিতেছিলেন। একই বয়সে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো তার শততম প্রফেশনাল গোল পূর্ণ করে ফেলেছিলেন। কিন্তু কার্লোস বাক্কা? অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, ২৩ বছর বয়সে তিনি প্রফেশনাল ফুটবলই শুরু করতে পারেন নি!

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বেড়ে ওঠা ম্যাডেইরার দরিদ্রতম পাড়ায়। লিওনেল মেসির পরিবারের আর্থিক দৈন্যতার কথা কে না জানে। কিন্তু সব বাধা উপেক্ষা করে, আর্থিক পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ফুটবলে এসে জীবনের মোড় বদলে গিয়েছে অনেক বড় তারকা ফুটবলারের। এরকমই একজন ফুটবলার ভিয়ারিয়ালের কলম্বিয়ান স্ট্রাইকার কার্লোস বাক্কা।

বাক্কা হয়তো বিশ্বের সবচেয়ে সেরা ফুটবলার নন। তবে ইউরোপের বিভিন্ন পর্যায়ের লীগে নিজেকে ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছেন এই কলম্বিয়ান স্ট্রাইকার। কিন্তু তার ফুটবলে আসাটা মোটেও সহজ কিছু ছিল না। রুপকথার গল্পের মতো ফুটবলে এসে প্রতিনিধিত্ব করেছেন কলম্বিয়া জাতীয় দলকেও।

"জীবন আর যাই হোক সহজ ছিল না। ২০ বছর বয়সে আমি আমার গ্রামেই থাকতাম এবং বাসের হেল্পার হিসেবে কাজ করতাম। এরপর কাজ করেছি ড্রাইভার হিসেবে। তখন সাময়িক সময়ের জন্য আমার ফুটবলের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই বয়সে এসে আমিও ফুটবল খেলার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম প্রায়। কিন্তু ভাগ্যক্রমে ওই বছরই আমার সুযোগ হয়েছিল অ্যাটলেটিকো জুনিয়র (কলম্বিয়ান ক্লাব)-এ ট্রায়াল দেওয়ার। ট্রায়াল থেকে তারা আমাকে দলে নেয়"- স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কাকে বলেছিলেন কার্লোস বাক্কা।

জীবনের বেশিরভাগ সময় বাক্কাকে দরিদ্রসীমার নিচে বাস করতে হয়েছিল। তবুও তিনি সবসময় নিজেকে প্রফেশনাল ফুটবলার হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন। কখনো বাসের হেল্পার হিসেবে কাজ করতেন, আবার কখনো কখনো সমুদ্রে মাছ ধরতেন। বাক্কার বয়স তখন ২৩। সমুদ্রে যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে যেতো, ঢেউ যখন আছড়ে পড়ত তার পায়ে, বাক্কা স্বপ্ন দেখতেন, তিনি মাঠে গোল করছেন আর স্টেডিয়ামে দর্শকদের সে কী বাঁধভাঙা উদযাপন! সবাই সমস্বরে বলছে, বাক্কা, বাক্কা... 

ক্যারিয়ারের শুরুতে মাঠে নামার সুযোগই পেতেন না বাক্কা। তাই তার ক্লাব তাকে তিন মৌসুমের জন্য ধারে অন্য ক্লাবে প্রেরণ করে। ধারে খেলা অবস্থায় বাক্কার প্রতি ভালোভাবেই চোখ রেখেছিল ক্লাব অ্যাটলেটিকো জুনিয়র। অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শনের জন্য তাকে আবারো ফিরিয়ে আনা হয়। অভিষেকের পর থেকেই অ্যাটলেটিকো জুনিয়রের নিয়মিত একাদশে নিজেকে ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠিত করেন বাক্কা।

অ্যাটলেটিকো জুনিয়রের জার্সিতে কার্লোস বাক্কা

২০১০ সালে কার্লোস বাক্কার দেওয়া গোলে কলম্বিয়ার লীগ টাইটেল নিশ্চিত হয় অ্যাটলেটিকো জুনিয়রের। লীগে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স নজর কেড়েছিল ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবগুলোর। তখন চিয়েভো, লোকোমোটিভ মস্কোর মতো ক্লাবগুলো তার প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু তিনি ২৬ বছর বয়সে ১.৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে বেলজিয়ান লীগের দল ক্লাব ব্রুগেতে যোগ দেন। প্রথম মৌসুমেই বেলজিয়ান প্রো-লীগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন। তার এমন পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে স্প্যানিশ লীগের দল সেভিয়া তাকে দলে ভেড়ায়। সেভিয়ার হয়ে তিনি পরপর দুটি ইউরোপা লীগ জিতেছিলেন। সেভিয়ার হয়ে ৭২ ম্যাচ থেকে ৩৪ গোল করেছিলেন বাক্কা। ২০১৫ সালে ৩০ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ইতালিয়ান ক্লাব এসি মিলানে যোগ দিয়েছিলেন এই প্রতিভাবান স্ট্রাইকার। ঐতিহ্যবাহী এই ক্লাবটি ততদিনে নিজেদের সেরা সময় পেরিয়ে এসেছে। এসি মিলানের হয়ে তেমন কোন সাফল্য না পেলেও ৭০ ম্যাচ থেকে করেছিলেন ৩১ গোল। ২০১৭ সালে ধারে এবং ২০১৮ সালে স্থায়ীভাবে স্প্যানিশ ক্লাব ভিয়ারিয়ালে চলে আসেন এই কলম্বিয়ান তারকা। ২০১৬ সালের শতবর্ষী কোপা আমেরিকা এবং ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে কলম্বিয়াকে প্রতিনিধিত্ব করেন কার্লোস বাক্কা। জাতীয় দলের হয়ে ৫২ ম্যাচ খেলে করেছেন ১৬ গোল।

বাক্কার ফুটবলার হবার কথা ছিল না, তারকা হবার কথা ছিল না। সেগুলো তিনি হয়েছেন, জীবন তাকে ধাক্কা দিয়েছে, কঠিন পরিস্থিতির সামনে ফেলেছে বারবার, সেগুলো তিনি বুক চিতিয়ে মোকাবেলা করেছেন। মাঠের খেলায় বাক্কা কখনও হারতে চান নি, সেই হার না মানা মানসিকতা বজায় ছিল জীবনের খেলাতেও। আর তাই সেখানে শেষ হাসিটা তিনিই হেসেছেন। ফুটবল ইতিহাস হয়তো বাক্কাকে মহাতারকা হিসেবে মনে রাখবে না, পরিসংখ্যানের অলিগলিতে তার নামটা খুঁজে পাওয়া যাবে না সেভাবে। কিন্ত বাক্কা থাকবেন ফুটবলপ্রেমীদের মনের গভীরে। যখনই জীবনযুদ্ধে দমে গিয়ে কেউ হাল ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেবে, তখন অনুপ্রেরণা যোগাবেন কার্লোস বাক্কা, তার জীবনের শূন্য থেকে শিখরে ওঠার গল্প দিয়েই...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা