গত বছর আমাদের সবার কাছে ফিফার প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশে আসা হয়ত অনেক বড় কিছু মনে হয়নি, কিন্তু এটিও জেনে রেখেন যে ফিফার প্রেসিডেন্ট এর ২০৬ এর মধ্যে ১৮৭ নাম্বার দেশে একদিন থেকে যাওয়াটা কিন্তু এত সহজ কোন ব্যাপার নয়। আমাদের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের মূল্য আছে বলেই সে একদিন এসে ঘুরে গেছিল...

প্রথমেই বলি যে আমি বাফুফের কোন কাউন্সিলর নই, আমার কোন ভোটিং পাওয়ারও নাই। বাফুফে ভোট বলতে আমি বুঝি যে কাউন্সিলরা এসে একদিন সবাই ভোট দিয়ে বিভিন্ন পদে প্রার্থীদের নির্বাচন করবেন এবং পরবর্তী ৪ বছর তারা বাংলাদেশের ফুটবল দেখাশোনা করবেন। সাধারণ মানুষের যে ধারণা আরকি। তবে এলেখাটি লেখার সাহস করার কারন একটিই, তার কারন ফুটবল ম্যানেজমেন্ট এর জ্ঞান। ফুটবল কোচিং নিয়ে কমবেশি সবাই পড়াশুনা করে এবং জানে। কিন্তু পুরা বিশ্বেই ফুটবল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশুনা করার সুযোগ খুবই কম এবং থাকলেও তা সবাই পড়েনা এবং যানেও না। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার সেই পড়াশুনা করার সুযোগ হয়েছে এবং সেই শিক্ষার আলোকে আজকে কিছু বাস্তব এবং প্র্যাকটিকাল কথা বলব।

সামনেই বাফুফে নির্বাচন, স্বাভাবিকভাবেই অনেকে নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন এবং দাঁড়াবেন। সময় যত ঘনিয়ে আসবে প্রার্থীরা তত বেশি সড়ব হয়ে উঠবেন নির্বাচন জয়ে জন্য। এটা দোষের কিছু না, এটাই পুরা বিশ্বের নিয়ম। আমরা এর ব্যতিত না। যা হচ্ছে বা চলছে, তা যথেষ্ট নরমাল ফুটবলের প্রেক্ষাপটে। বাফুফের প্রেসিডেন্ট সালাউদ্দিন সাহেব গত ১২ বছর ধরে এই একই পদে আছেন। স্ট্র্যাটিজিকভাবে বিরোধীদল তার অর্জন, সফলতা এবং বিফলতা নিয়ে কথা বলে মানুষকে তাকে ভোট দেয়া থেকে বিরত রাখবে এটাই স্বাভাবিক। এত সবকিছুর মাঝে প্রশ্ন হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট বা তার প্যানেল বদলে দিলেই কি বাংলাদেশের ফুটবল এর উন্নতি হবে?

ফুটবল এখন শুধু একটি মাল্টিন্যাশনাল খেলা নয়, এটি একটি মাল্টিন্যাশনাল ব্যবসা। এবং যখন একটা মাল্টিন্যাশনাল ব্যবসা দুনিয়ার সব জায়গায় বিস্তার করে তখন তারা একটি সুনির্দিষ্ট কমান্ড চেইন বানায়। ফিফা এর ব্যতিক্রম নয় এবং ফিফা এজন্য প্রথমে কনফেডারেশন (এএফসি, উয়েফা) বানিয়েছে এবং এরপর যার যার দেশের ফুটবল ফেডারেশন। ফিফার কাজ কনফেডারেশন এর কথা শুনা, কনফেডারেশন এর কাজ দেশের ফেডারেশনের কথা শুনা এবং দেশের ফেডারেশনের কাজ হচ্ছে দেশের ক্লাব এবং বাকি সব দলের কথা শুনে কাজ করা। ফিফা যদি এখন বাংলাদেশের ফুটবল ক্লাবের কথা শুনতে যায় তাহলে পুরা সিস্টেমটা বিপর্যয়ে পড়বে কারন তখন ২০৬ দেশের সকল ফুটবল ক্লাব (১০,০০০ এর ও উপরে)ফিফার সাথে কথা বলতে যাবে যেটা ফিফার কেন, কারো পক্ষে সামলানো সম্ভব নয়। এজন্যই এই কমান্ড চেইন, ঠিক আপনার অফিসের মত যেখানে আপনি আপনার ম্যানেজারকে বলবেন এবং আপনার ম্যানেজার ব্যাপারটিকে উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাবে।

এবার আসি একটু হাল্কা ইতিহাসে, কারন ইতিহাস না ঘাটলে সমাধান মিলে না। ইংল্যান্ড এ ১৮৮৩-৮৪ সালের দিকে ফুটবল তখনও নতুন নতুন সাড়া জাগাচ্ছে৷ খেলাটা তখনও বিত্তবানদের হাতে, যারা নিয়ম বানায় তারাই ছিল বিত্তবান ফুটবল দলের খেলোয়াড়। তখনকার সবচেয়ে নামকরা টুর্নামেন্ট এফএ কাপও তারাই জিতত। যারা দিন আনে দিন খায়, ফ্যাক্টরিতে কাজ করে তারা ফুটবল ঠিকই খেলত কিন্তু অবসরে এবং এজন্য বিত্তবানদের সাথে জয়লাভ একধরনের অসাধ্য বেপার ছিল। সেসময় ফুটবল খেলার জন্য প্লেয়াররা টাকা পাবে, এটি নিয়ম এর বাইরে ছিল এবং কেউ যদি টাকা নিয়ে খেলে তাকে খেলা থেকে বহিস্কার করা হত, সাথে সাথে সেই ফুটবল ক্লাব কেও। এমন একটি সময়ে ফ্যাক্টরি ওয়ার্কারদের গায়ে গতরে খেটে আবার ফুটবল মাঠে জেতা দুসহ হয়ে উঠেছিল কিন্তু এসব খেটে খাওয়া মানুষের একমাত্র বিনোদন ছিল এই ফুটবল। তাই একটি ক্লাবের প্রেসিডেন্ট লুকিয়ে লুকিয়ে কয়েকজন প্লেয়ারকে নিজের ফ্যাক্টরিতে কাজ দিলেন এবং বললেন তোমাদের কাজ ফুটবল খেলে কাপ জিতানো এবং মানুষের মুখে হাসি ফুটানো। সেই ১৮৮৩-৮৪ সালে ফুটবল ক্লাব ব্ল্যাকবার্ন রোভার্স এফএ কাপ জিতল সবার মন জয় করে ফুটবল খেলে। যদিও তখনকার ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের এতে দ্বিমত ছিল কিন্তু মানুষের এত ইন্টারেস্ট দেখে ইংলিশ অ্যাসোসিয়েশন নিয়ম বদলালো এবং প্লেয়াররা ফুটবল খেলার জন্য টাকা পাওয়া শুরু করল। যেই ফুটবল খেলে এখন মেসি-রোনালদো কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছে, সেই ফুটবল একসময় এই টাকা নেয়াটাকেই অপরাধ মনে করত!

এখন আসি কেন আমি এই ইতিহাস বললাম। একটি দেশের ফুটবল ফেডারেশন এর কাজ অনেক সীমাবদ্ধ নজরদারী এর মধ্যে দিয়ে যায়। বাংলাদেশ হিসেবে আমরাও এর ব্যতিক্রম নই। ফিফা এবং এএফসি এর নিয়ম মেনেই আমাদের চলতে হবে। ফেডারেশন এর কাজ মূলত নিয়মনীতি ঠিক করা এবং সবকিছু নিয়মমেনে চলছে কিনা তা তদারকি করা। আপনি যদি ফিফার জায়গা থেকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট দেখেন, বাংলাদেশের ফুটবল কিন্তু তার বেসিক কাজগুলো ঠিক মতই করছে। ওয়ার্ল্ডকাপ বাছাইপর্বের খেলা হচ্ছে, এএফসি কাপ হচ্ছে, প্রফেশনাল লীগ চলছে, নারী ফুটবল দলও আছে। কাঠামোগত বিশ্লেষণে সব মোটামুটি ঠিকমতই চলছে এজন্য ফিফা এবং এএফসি খুশি। আপনার জাতীয়দল খারাপ করছে কিনা, এটা আপনার দেশের সমস্যা, ফিফার বা এএফসি এর না। ফিফা বা এএফসি এরজন্য সর্বোচ্চ আপনাকে কোচ দিয়ে বা ফান্ড দিয়ে সাহায্য করবে এর বেশি কিছুই না। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে দেশের ফুটবল আগাবে কিভাবে?

এরজন্য এবার আপনাকে আবার ওই ১৮৮৩-৮৪ সালের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। ইংলিশ অ্যাসোসিয়েশন কিন্তু কোন প্রথম পদক্ষেপ নেয় নাই, নিবেও না কারন এটা তাদের কাজ নয়। একটি ক্লাব নিয়ে এসেছিল নতুনত্ব, নতুন আইডিয়া এবং সাথে মানুষের সাপোর্ট। এখন এইযে আপনি দেশ বিদেশের খেলা দেখছেন এবং ভাবছেন কিভাবে সম্ভব এত সুন্দর ফুটবল কাঠামো। সবই সম্ভব হয়েছে সে দেশের ফুটবল ক্লাবের জন্য, তাদের একতার জন্য। তারা সবাই মিলে এককাতারে দাড়িয়ে বলেছে আমরা রাজি আপনি পারমিশন দেন, তখনই সেই অ্যাসোসিয়েশনের সাহস হয়েছে তথাকথিত প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে কিছু করার। এবং সেই বাইরে কিছু করতে করতেই ফুটবল আজ এইখানে এসে পৌছিয়েছে। এখন যদি আসি আমাদের দেশের ক্লাব ফুটবলে। আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর হতে চলল, আবাহনী-মোহামাডান নিয়ে মানুষের ইতিহাস ঘাটাঘাটি আর গর্বের শেষ হয় না কিন্তু যদি প্রশ্ন করি ৪৮-৮৭ বছরের ইতিহাসে তাদের নিজস্ব স্টেডিয়ামটা কোথায় তখন সবাই চুপ। আজকে যদি আবাহনী-মোহামাডান এর নিজস্ব কোন স্টেডিয়াম না থাকে তবে সেটার দোষ বাফুফের নয়, সেটা সেই ফুটবল ক্লাবের। একটা স্টেডিয়াম বানাতে এবং চালাতে খরচ করতে হয়। আমাদের ক্লাবগুলো একটাও তা করতে রাজি নয়। আপনি আপনার নিজের এলাকায়, নিজের মানুষের জন্য না খেলে যদি অন্য এলাকায় গিয়ে টাকা বাঁচানোর জন্য খেলে আসেন তাহলে ফুটবল আগাবে কিভাবে আর সাপোর্টারই বাড়বে কিভাবে? ফুটবল ক্লাবের প্রথম শর্তই তো হচ্ছে এটি একটি এলাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে যেখানের মানুষকে এই ক্লাব প্রতিনিধিত্ব করবে। সেই এলাকায় স্টেডিয়াম থাকবে এবং মানুষ সেখানে গিয়ে খেলা দেখবে, তাদেরকে আপন করে নিবে। আমার নিজের বাসা হচ্ছে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এবং যখন আমি ভোরবেলা আবাহনী মাঠে যাই, সেখানে সাধারণ  মানুষের আবাহনী নিয়ে প্রচুর গর্ব এবং ভালবাসা। কিন্তু খেলা দেখতে একজনও যান না। কিন্তু ঠিক সেই সন্ধ্যাবেলা, আবাহনী মাঠের পাশে বসেই আড্ডা মারেন সবাই। শুধু ভাবেন এতদিনে যদি আবাহনীর সব খেলা, আবাহনীর মাঠেই সন্ধ্যাবেলায় হত তাহলে কি হত? আপনি মানুষকে খেলা দেখার টিকিট দিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারতেন না।

বাফুফে প্রেসিডেন্টের কি এই ১২ বছরে কি কোন ভুল নেই? অবশ্যই আছে। তার প্রথম ভুল, ১২ বছরেও ফুটবলের জন্য ডেডিকেটেড একটা স্টেডিয়াম না করা। আপনি ন্যাশনাল স্পোর্টস কাউন্সিলের ওয়েবসাইট যান, ৬টি ক্রিকেটের জন্য স্টেডিয়াম পাবেন, এমনকি বাস্কেটবল, ভলিবল, বক্সিং, শুটিং, টেনিস এবং কাবাডির জন্যও স্টেডিয়াম পাবেন কিন্তু ফুটবলের জন্যই ডেডিকেটেড একটা স্টেডিয়ামও অফিশিয়ালি পাবেন না। যাও একটা স্টেডিয়াম ফুটবল পায় সেটা কোন ফুটবল স্টেডিয়াম নয়। মূলত এটা ক্রিকেট স্টেডিয়াম যেটাকে সবদিক দিয়ে কাজ করে ফুটবলের জন্য বানানো হয়েছে।

এখন শেষ পর্যায়ে আবার সেই প্রথম প্রশ্নে আসি, সভাপতি বদলে কি দেশের ফুটবলের কোন পরিবর্তন হবে? আমার পারসোনাল উত্তর হল যে না হবে না। কারন আমরা ক্লাবগুলো যতদিন দায়সারা গোছের মানসিকতা নিয়ে চলব, কোন প্রেসিডেন্টই এসে কোন কিছু বদলাতে পারবে না রাতারাতি। আজকে আমাদের প্রেসিডেন্ট সালাহউদ্দিন সাহেবের ফিফা এবং এএফসিতে একটা গ্রহনযোগ্যতা আছে। উনি চলে গেলে আমরা সেটাও হারাব। বরং আমার মতে আজ আমরা যদি দেশের ফুটবল বদলাতে চাই এবং পজিটিভ দিকে নিয়ে যেতে চাই, আমাদের ক্লাবগুলোর আরও বেশি একসাথে এককাতারে দাড়িয়ে কাজ করতে হবে যেখানে ফিফা এএফসি লেভেলে সালাহউদ্দিন  সাহেব থেকে দেনদরবার করে আমাদের জন্য আরও সহায়তা আনতে পারবেন, যেটা কিনা একজন প্রেসিডেন্টের মূল কাজ। গত বছর আমাদের সবার কাছে ফিফার প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশে আসা হয়ত অনেক বড় কিছু মনে হয়নি, কিন্তু এটিও জেনে রেখেন যে ফিফার প্রেসিডেন্ট এর ২০৬ এর মধ্যে ১৮৭ নাম্বার দেশে একদিন থেকে যাওয়াটা কিন্তু এত সহজ কোন ব্যাপার নয়। আমাদের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের মূল্য আছে বলেই সে একদিন এসে ঘুরে গেছিল।

সর্বশেষ সবার কাছে আমার একটাই রুপক প্রশ্ন, চিন্তা করেন এখন ২০২২ সাল, ফিফা এবং এএফসি এর সভাপতি ঢাকায় এসেছেন ইন্সপেকশনে। টেবিলে দুজন বসে আছেন এবং সাথে বসবেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি। মিটিং এ নেগোসিয়েশন এর মাধ্যমে আদায় করে নিতে হবে কিছু দাবি ফিফা এএফসি থেকে। এবার তাকান এবারের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদের দিকে....কাকে বসাতে চান আপনি এই নেগোসিয়েশনে?


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা