বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের এই আসরে বাংলাদেশের উন্নতিটা চোখে পড়েছিল মিডফিল্ডার এবং ফরোয়ার্ডদের বোঝাপড়ার মধ্যে। প্রতিপক্ষের সীমানাতেই তাদেরকে হাই প্রেসিং করে বল কেড়ে নেওয়া, বল ইন্টারসেপ্ট করার সাথে সাথে দ্রুত আক্রমণে উঠা, প্রতিপক্ষের সাথে পাল্লা দিয়ে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নতি ছিল লক্ষণীয়।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের এই বিশেষ আসরটি শুরু থেকে জন্ম দিয়েছিল একের পর এক বিতর্ক। বিদেশী দলগুলোর পূর্ণশক্তির স্কোয়াড না আনা, বুরুন্ডির ফ্লাইট জটিলতা, প্রচার-প্রচারণা নিয়ে ক্রীড়াপ্রতিমন্ত্রীর অসন্তোষ, টুর্নামেন্টজুড়ে বাজে রেফারিং ইত্যাদি বিষয় নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত বিষয় ছিল বাংলাদেশের দল গঠনে অস্বচ্ছতা। উদ্বোধনী ম্যাচে ফিলিস্তিনের বিপক্ষে রায়হান-মামুনুলের একাদশে থাকা নিয়েও উঠেছিল নানা প্রশ্ন।

পুরো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ হজম করেছে পাঁচটি গোল, যার চারটিতেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দায় রয়েছে ডিফেন্ডার রায়হান হাসানের। ফিলিস্তিনের প্রথম গোলের জন্য দায় এড়াতে পারেন না অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার মামুনুলও। সেদিন হতাশ করেছিলেন স্ট্রাইকাররাও। একের পর এক সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি তারা। বলতে গেলে, সেদিন সম্পূর্ণ দলগত ব্যর্থতায় বাংলাদেশকে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল ২-০ গোলের ব্যবধানে। 

গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে এই আসরে নিজেদের সবচেয়ে সেরা নৈপূণ্য উপহার দিয়েছিল বাংলাদেশ। ইনজুরির কারণে সেদিন দলে ছিলেন না অধিনায়ক জামাল এবং ডিফেন্ডার ইয়াসিন। প্রথম একাদশ থেকে বাদ পড়েছিলেন আগের ম্যাচে ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়া রায়হান-মামুনুলও। গোলকিপার আশরাফুল, ডিফেন্ডার তপু এবং মিডফিল্ডার সোহেল ছাড়া সেদিনের একাদশে বাকী সবাই ছিলেন তরুণ। তারুণ্য নির্ভর এই দল নিয়েই দারুণ ঝলক দেখিয়েছিলেন কোচ জেমি ডে। আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে বাংলাদেশ সেদিন দিশেহারা করে দিয়েছিল শ্রীলংকাকে। জোড়া গোল করে সেই ম্যাচে নায়ক বনে গিয়েছিলেন মতিন মিয়া। সবার অনেক প্রশংসাও পেয়েছিলেন সিলেট থেকে উঠে আসা এই তরুণ।

সেদিন ইব্রাহিম, সাদ, সুফিলও গতি দিয়ে বারবার ত্রাস ছড়িয়েছিলেন লঙ্কান রক্ষণভাগে। এক রাশ মুগ্ধতা নিয়ে সেদিন তাদের নজরকাড়া পারফরম্যান্স উপভোগ করেছিল গ্যালারিতে থাকা দর্শকরা। কিন্তু ম্যাচের শেষদিকে বিতর্কিত লাল কার্ড দেখে তপু বর্মণ মাঠ ছাড়লে গ্যালারিজুড়ে নেমে আসে হতাশা। বাজে রেফারিংয়ের শিকার হওয়া তপু ওই ম্যাচে গোলও পেতে পারতেন কিন্তু তার নিশ্চিত গোলকে অফসাইডের সিদ্ধান্ত দিয়ে বাতিল করে দেয় রেফারি। 

৩-০ গোলে শ্রীলংকাকে হারিয়েও বাংলাদেশ দল খুবই শঙ্কিত ছিল সেমিফাইনাল নিয়ে। কারণ, সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তারা পাচ্ছেনা ডিফেন্সের দুই ভরসার প্রতীক ইয়াসিন এবং তপুকে। আর এই দুজনের অনুপস্থিতিতে দল গঠনে আবারো অযাচিতভাবে হস্তক্ষেপ করা হলো। তপুর পরিবর্তে সেন্টারব্যাক মঞ্জুর রহমান মানিককে রেখে, সেন্টার ডিফেন্সের দায়িত্ব দেওয়া হয় রাইটব্যাক রায়হান হাসানকে। ফিলিস্তিনের বিপক্ষে রাইটব্যাক পজিশনেই অদক্ষতার প্রমাণ দেওয়া রায়হান যে বুরুন্ডির বিপক্ষে বাংলাদেশকে ডোবাতে পারেন,  সেটা আগে থেকেই অনুমেয় ছিল। হলোও তাই। বুরুন্ডির করা তিনটি গোলেই তিনি নিতান্তই একজন দর্শক হয়ে চেয়ে রইলেন। প্রত্যেকটি গোলের সময় আক্রমণগুলো রুখে দেওয়ার জন্য সেভাবে প্রচেষ্টা করতে তাকে দেখা যায়নি। ফলাফল হিসেবে ৩-০ গোলের ব্যবধানে বুরুন্ডির কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় স্বাগতিক বাংলাদেশ।

বিশ্বকাপ বাচাই পর্বের ম্যাচগুলোতে ডিফেন্সিভ দৃঢ়তার পরিচয় দেওয়া বাংলাদেশ, এই টুর্নামেন্ট ডিফেন্ডিংয়ে ছিল পুরোটাই ব্যর্থ। প্রতিপক্ষের গতিশীল আক্রমণভাগের ফুটবলারদের রুখতে হিমশিম খেতে হয়েছে ডিফেন্ডারদের। প্রথম ম্যাচে সেন্টারব্যাকের দায়িত্বে থাকা দুই ডিফেন্ডার ইয়াসিন এবং তপুর বোঝাপড়াটাও সেভাবে হয়নি। প্রথম দুই ম্যাচে দারুন নৈপূণ্য প্রদর্শন করা রহমত মিয়া শেষ ম্যাচে ছিলেন নিষ্প্রভ। শেষ দুই ম্যাচে সুযোগ পাওয়া বিশ্বনাথ ঘোষ বরাবরের মতোই অসাধারণ ফুটবল খেলেছিলেন। দারুণভাবে ম্যাচ রিড করার ক্ষমতা প্রদর্শন করেছিলেন রিয়াদুল হাসান রাফি। কয়েকটি দুর্দান্ত সেভ ছিল গোলরক্ষক আশরাফুল রানার। 

বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের এই আসরে বাংলাদেশের উন্নতিটা চোখে পড়েছিল মিডফিল্ডার এবং ফরোয়ার্ডদের বোঝাপড়ার মধ্যে। প্রতিপক্ষের সীমানাতেই তাদেরকে হাই প্রেসিং করে বল কেড়ে নেওয়া, বল ইন্টারসেপ্ট করার সাথে সাথে দ্রুত আক্রমণে উঠা, প্রতিপক্ষের সাথে পাল্লা দিয়ে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নতি ছিল লক্ষণীয়। কয়েকজন ফুটবলারের অবিশ্বাস্য গতি নজর কেড়েছিল সবার। সলো রান আর ড্রিবলিং দিয়ে সমর্থকদের মুগ্ধ করেছিলেন ইব্রাহিম। মতিনও সলো রানের পাশাপাশি দেখিয়েছিলেন দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ের ঝলক। বল উইন করা কিংবা সতীর্থদের জন্য স্পেস বের করার দায়িত্ব পালন করেছিলেন সুফিল। বল রিকোভার করা কিংবা প্রতিপক্ষের মাঠে প্রেসিং করে বল কেড়ে নিতে দেখা গিয়েছিল সাদকে। মাঝে মাঝে কিছু দুর্দান্ত ফরোয়ার্ড থ্রুও দিয়েছিলেন সাদ। কিন্তু নিজেদের বাজে ফিনিশিং দক্ষতার জন্য সমালোচিত হয়েছিলেন সুফিল-সাদ-ইব্রাহিমরা। 

এছাড়া প্রতিপক্ষের সাথে পাল্লা দিয়ে সমানভাবে মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন জামাল-সোহেল-মানিক ত্রয়ী। মাঝমাঠ থেকে ভালভাবেই বল যোগান দিয়েছিলেন ফরোয়ার্ডদের। সুযোগও তৈরি করেছিলেন অনেক। যদিও বেশিরভাগ সময় তাদের তৈরি করা সুযোগগুলো গোলের মুখ দেখেনি ফরোয়ার্ডদের ফিনিশিং ব্যর্থতায়। এদিকে প্রতিপক্ষের কাউন্টার ঠেকাতে না পারার দায়টাও এড়াতে পারেননা তারা। 

এই আসরের মাধ্যমে জেমি ডে তার চিরাচরিত ডিফেন্সিভ ট্যাক্টিস থেকে বেরিয়ে এসে আক্রমণাত্মক কৌশলে খেলিয়েছিলেন বাংলাদেশকে। এক ফিনিশিং ব্যর্থতার জন্য আক্রমণাত্মক ফুটবলে বাংলাদেশের সামর্থ্যের রেখাটা ভালভাবে নির্ণয় করা যায়নি। জেমি'র এই ফুটবল দর্শনে বাংলাদেশ হারিয়েছিল নিজেদের ডিফেন্সিভ দৃঢ়তা। তবুও দল নির্বাচনে স্বচ্ছতা আর ফিনিশিংয়ে উন্নতি করতে পারলে হয়তো এই ট্যাক্টিসেই বাজিমাত করতে পারবে বাংলাদেশ।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা