বাংলাদেশ দলের 'ভারত' গেরোটা কাটলো অবশেষে, জুনিয়র টাইগারদের হাত ধরে। মাঠে-মননে সবচেয়ে পরিণত দলটাই কাটাতে পারলো সেই বাধা। যুব বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারতকে ডাকওয়ার্থ লুইস পদ্ধতিতে ৩ উইকেটে হারিয়ে নিজেদের প্রথম শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশ দল!

লো-স্কোরিং একটা ম্যাচ, সেটাই ছড়ালো রুদ্ধশ্বাস এক রোমাঞ্চ। এই ম্যাচের প্রতিটা বল, প্রতিটা মিনিট, প্রতিটা মুহূর্তকে নিয়ে আলাদা আলাদা গল্প লেখা যাবে। প্রতিটা গল্পের শেষে জ্বলজ্বল করবে একটা লাইন- অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ দল! যে অর্জন সাকিব-তামিমদের নেই, মিরাজ-মুস্তাফিজদের নেই, সেটাই করে দেখালেন আকবর-রাকিবুলরা! 

ভারতের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপকে অল্প রানে থামিয়ে দেয়া, সেই রান তাড়ায় উড়ন্ত সূচনা, তারপর দলবেঁধে খেই হারানো, হারের শঙ্কা জাগিয়েও ফিরে আসা, ধীরে ধীরে জয়ের পথে একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়া, বৃষ্টি বাধা, নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়েও শেষমেশ জয়ের এভারেস্টে আরোহন, তার পরেও ক্ষণিক সময়ের বিতর্ক- ফাইনাল নামের উপন্যাসে অধ্যায়ের তো শেষ নেই! কোরিয়ান থ্রিলারের চেয়ে কম সাসপেন্স তো ছিল না অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের এই ফাইনালে! 

ভারতের এই দলটা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন, পুরো টুর্নামেন্টে তাদের জার্নিটাকে ড্রিম রান বললেও কম বলা হয়। একেকটা দলকে একশো, দেড়শো, দশ উইকেট, নয় উইকেটের ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে তারা এসেছে ফাইনালে। তাদের সামনে এবারই প্রথম ফাইনালে ওঠা বাংলাদেশ। সম্মানজনক পরাজয়টাই ভবিতব্য ছিল, কিন্ত জুনিয়র টাইগারেরা ভেবে রেখেছিল অন্যরকম কিছুই। 

ম্যাচের শুরু থেকেই ভীষণ আক্রমণাত্নক বাংলাদেশ, শরীরী ভাষায় ঠিকরে বেরুচ্ছিল নিজেদের উজাড় করে দেয়ার ঝাঁঝ। প্রতিপক্ষ কে, কতটা শক্তিশালী তারা, তাদের ফর্ম কেমন- সেসব না ভেবেই সর্বোচ্চটা ঢেলে দিয়েছেন সবাই, তাতেই ১৭৭ রানে বাঁধা পড়েছে ভারত, যশস্বী জয়সওয়ালের ৮৮ রানের ইনিংসের পরেও বড় সংগ্রহ পেতে দেয়নি ভারতকে।

সেই রান তাড়া করতে নেমে সহজ জয়ের ইঙ্গিতই দিচ্ছিলেন দুই ওপেনার তানজিদ এবং ইমন। কিন্ত ফাইনাল ম্যাচ কি আর রোমাঞ্চ ছাড়া মানায়? সেই রোমাঞ্চ ফিরিয়ে আনতেই মঞ্চে অশ্বত্থামা হবার নেশায় আবির্ভূত হলেন রবি বিষ্ণোই। একে একে চারটা উইকেট তুলে নিলেন তিনি, বাংলাদেশকে পাঠিয়ে দিলেন ব্যাকফুটে, ভারত তখন চালকের আসনে। 

হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়া সেই ম্যাচটা বাংলাদেশের দিকে ফিরিয়েছেন অধিনায়ক আকবর আলী, ক্যাপ্টেন লিডিং ফ্রম দ্য ফ্রন্টের দারুণ এক প্রদর্শনের জন্যে ফাইনালটাকে বেছে নেবেন, সেটা হয়তো ভাবেনি কেউই। আকবর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, জয়টা নিশ্চিত করেই মাঠ ছেড়েছেন তিনি। সরল দোলকের মতো দুলতে থাকা ম্যাচটাকে তিনি হেলিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রান্তে, লড়েছেন সর্বস্ব উজাড় করে। মাথা ঠান্ডা রেখে দলকে টেনেছেন অধিনায়ক, দায়িত্ব শেষ হবার আগে মনসংযোগ বিচ্যুত হয়নি একবারও। 

এমন ম্যাচে স্কোরকার্ড ফিকে লাগে, এই অর্জনের পরে ব্যক্তিগত অর্জনগুলোকে ভীষণ পানসে মনে হয়। বাংলাদেশ দলের 'ভারত' গেরোটা কাটলো অবশেষে, জুনিয়র টাইগারদের হাত ধরে। মাঠে-মননে সবচেয়ে পরিণত দলটাই কাটাতে পারলো সেই বাধা। বিশ্বকাপ জয়টাকে স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে এখনও, এমন একটা দিনের প্রত্যাশাতেই তো আমরা ছিলাম! 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা