উইকেটে ভূত-প্রেত বা সাপখোপ লুকিয়ে ছিল না, আনপ্লেয়েবল উইকেটও ছিল না। পাকিস্তানের বোলারেরা ধ্বংসযজ্ঞ চালাননি, খুব ভালো ডেলিভারির সংখ্যাও হাতেগোনা। ফিল্ডিং আপ টু দ্য মার্ক ছিল না। তবুও উদ্বোধনী জুটিতে ৭১ রান আসার পরেও বাংলাদেশের ইনিংস থামলো ১৪১- এ, কারণ ধীরগতির ব্যাটিং। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই ধারাবাহিকতায় ব্যাটিং করে গেলেন সবাই, ইকনোমি রেটটাও ছয় থেকে সাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলো পুরোটা সময়।

ম্যাচ জেতার জন্যে ভালো ব্যাটিং লাগে, নিখুঁত বোলিং পারফরম্যান্সের দরকার হয়, টাইট ফিল্ডিংয়ে প্রতিপক্ষকে আটকে রাখলে ম্যাচ জেতাটা সহজ হয়। কিন্ত এসবের বাইরে একটা ম্যাচে জয়ের জন্যে সবচেয়ে বেশি দরকারী যে জিনিসটা, সেটা হচ্ছে সাহস আর জয়ের ইচ্ছা। এই দুটো না থাকলে ভালো পারফরম্যান্স আকাশ থেকে টুপ করে এসে পড়বে না। বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে সেই জয়ের ইচ্ছেটাই খুঁজে পাওয়া যায়নি আজ, টি-২০ ম্যাচে ওয়ানডে স্টাইলে ব্যাটিং করে কি আর ম্যাচ জেতা যায়?

তামিম দায়িত্ব নিয়ে খেলার কথা বলেন সবসময়। দায়িত্ব নিয়ে খেলার সংজ্ঞাটা তার চোখে কী, এটা জানা খুব জরুরী। টেস্টে দায়িত্ব নিয়ে খেলাটা একরকম হবে, ওয়ানডেতে সেটা বদলে যাবে, আর বিশ ওভারের ক্রিকেটে উইকেটের চরিত্র বুঝে বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রানের গতি বাড়ানোটাই 'দায়িত্ব নিয়ে খেলা'র অর্থ হওয়া উচিত ছিল। কিন্ত তামিম একপাশ আগলে রেখে ধীরগতির ব্যাটিংটাকেই ফিক্সড করে নিয়েছেন।

টেস্টে এটা ভালো, ওয়ানডেতে বিরক্তিকর হলেও মেনে নেয়া যায়, কিন্ত টি-২০ তে এই ব্যাপারটা কোনভাবেই সহনীয় নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রায় চৌদ্দ বছর পার করে ফেলেছেন তামিম, এখনও যদি তিনি এটা না বোঝেন যে ক্রিকেটের আলাদা আলাদা ভার্সনের সঙ্গে ব্যাটিং এপ্রোচটাকেও বদলে নিতে হবে, সময়ের সঙ্গে ঝালিয়ে নিতে হবে সক্ষমতাকে- তাহলে সেটা তাকে কেউ জোর করে বোঝাতে পারবে না। তামিম চাইলে শোয়েব মালিকের দিকেই তাকাতে পারেন। ধীরগতির শুরু মালিকও করেন, কিন্ত স্ট্রাইক রোটেট করে স্কোরবোর্ডের ওপরে চাপটা পড়তে দেন না তিনি। আর একবার সেট হয়ে গেলে মালিকের ব্যাটে রানের চাকা বনবন করে ঘুরতে থাকে, তামিমের বেলায় সেটা অনুপস্থিত।

৩৪ বলে ৩৯ রানের ইনিংসটা এযুগের টি-২০'র সঙ্গে বেমানান

৩৪ বলে ৩৯ রানের ইনিংস খেলেছেন তামিম, পাঁচটা বাউন্ডারি থেকে এসেছে ২২ রান। অর্থাৎ বাকী ২৯ বলে তামিম সংগ্রহ করেছেন মাত্র ১৭ রান! তার ওপেনিং পার্টনার হিসেবে নামা নাঈম শেখও ৪৩ রান করেছেন ৪১ বলে। পাওয়ারপ্লে-তে যেখানে পাওয়ার হিটের আসর বসার কথা, সেখানে পঁয়ত্রিশ রান তুলেই ক্ষান্ত থেকেছে এই জুটি।

একই ঘরানার দুজন ব্যাটসম্যানকে কোন যুক্তিতে ইনিংস উদ্বোধনে পাঠিয়েছিল টিম ম্যানেজমেন্ট, এটাও পরিস্কার নয়। যে উইকেটে ১৭০ রানও নিরাপদ নয়, সেখানে বাংলাদেশ শুরু থেকেই একশো চল্লিশ পেরুনোর মানসিকতা নিয়ে ব্যাটিং করেছে, অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে সত্যি, কিন্ত ম্যাচ জেতার জন্যে সেটা মোটাও যথেষ্ট ছিল না। তামিম-নাইমের বিদায়ের পরে বাকী ব্যাটসম্যানদের কারো মধ্যেও আগ্রাসী মনোভাবটা ফুটে ওঠেনি বিন্দুমাত্র।

ওয়ানডে ম্যাচে এখনও বাংলাদেশ যে ব্যাটিংটা করে, সেটা প্রাগৈতিহাসিক কালের ব্যাটিং। ওয়ানডেতে এখন ৩২০-৩৩০ রানও নিরাপদ নয়, সেখানে আমরা কোনমতে ২৭০/২৮০ তুলতে পারলেই খুশি হয়ে যাই। টি-২০ তেও আমরা সেই ঘুমপাড়ানো ব্যাটিংটাই করি, খেলাটা যে মাত্র বিশ ওভারের, সেটা আমাদের মাথায় থাকে না। টি-২০ যস রানের খেলা, উইকেট বাঁচানোর খেলা নয়- এটা আমরা যতোদিন না বুঝবো, ততদিন ওই ম্যাচ জেতার মানসিকতাটাও আমাদের মধ্যে তৈরী হবে না। মাথার মধ্যে ফিক্সড হয়ে থাকা এই ডিফেন্সিভ মেন্টালিটিটা ভেঙে ফেলা সবচেয়ে জরুরী, ব্যাটিং টেকনিক শুদ্ধ করার চেয়েও বেশি।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা