ফুটবল মাঠের নৈপূণ্য দিয়ে তিনি কখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে পারেননি। কিন্তু নিজের জীবনে বলার মতো যে গল্প তৈরি করে চলেছেন তিনি, সেই গল্পের জন্যই একদিন মানুষ স্মরণ করবে তাকে।

দুর্দান্ত গোল কিংবা চমৎকার ফুটবলীয় নৈপূণ্য দেখানো ফুটবলাররাই বনে যান ম্যাচের নায়ক। তাদের নামেই তৈরি হয় সংবাদের শিরোনাম। এই নায়কদের নৈপূণ্যের আড়ালে ডেকে যাওয়া কয়েকজন ফুটবলার এমন আছেন, যাদেরকে খুব বেশি ম্যাচের মুল দৃশ্যপটে দেখা যায় না। কিন্তু আড়াল থেকে একজন পরিশ্রমী শ্রমিকের মতোই নিজের কাজটা করে যান সুনিপুনভাবে। এমনই একজন ফুটবলার বসুন্ধরা কিংসের মিডফিল্ডার শেখ আলমগীর কবির রানা। 

বসুন্ধরা কিংসের জার্সিতে এখন পর্যন্ত দুই গোল করেছেন রানা, কিন্তু কখনো ম্যাচজয়ী নায়ক হওয়ার স্বাদ নিতে পারেন নি। গত বছর জুনে বসুন্ধরার জার্সিতে নিজের অভিষেক গোলের দিনে, মুক্তিযোদ্ধার বিপক্ষে নাসিরউদ্দিন চৌধুরির জোড়া গোল আড়াল করে দিয়েছিল তার নৈপূণ্যকে। ১৭ দিন পর আবারো গোলের দেখা পেয়েছিলেন রানা। তবে এবারো নায়ক নয়, বরং পার্শ্ব নায়ক হিসেবেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে তাকে। ব্রাদার্স ইউনিয়নের বিপক্ষে সেদিন হ্যাটট্রিক করে ম্যাচের সবটুকু আলো কেড়ে নিয়েছিলেন মতিন মিয়া। রানা এমন একজন ফুটবলার যিনি কখনো সেভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে পারেননি। কিন্তু তাতে কি? ইতিহাস যদি কখনো স্মরণ করে সেই ম্যাচগুলোর কথা, তবে দেখতে পাবে স্কোরশিটে জ্বলজ্বল করছে আলমগীর রানার নাম। 

এমনিতে রানা নিজেকে খুবই ভাগ্যবান ভাবতে পারেন। সময়ের সেরা ক্লাবগুলোর পছন্দের তালিকাতে বরাবরই ছিলেন তিনি। শুরুটা হয়েছিল ঐতিহ্যবাহী মোহামেডানের জার্সিতে। এরপর খেলেছেন মুক্তিযোদ্ধার হয়ে। আবাহনীর সাম্রাজ্যে ভাগ বসানো শেখ জামালের সেই বিখ্যাত দলটিতেও ছিল তার নাম। তিনি গায়ে জড়িয়েছেন দেশের অন্যতম সেরা ক্লাব শেখ রাসেলের জার্সিও। বর্তমান লীগ চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংসের আবির্ভাবের সময় থেকেই তাদের স্কোয়াডে জায়গা করে নিয়েছেন রানা। ব্যক্তিগত অর্জন ততটা সমৃদ্ধ না হলেও, দলীয় অর্জন নিয়ে কখনো আক্ষেপ থাকার কথা নয় তার। ঘরোয়া ফুটবলের সম্ভাব্য সকল শিরোপারই স্বাদ পেয়েছেন এই ফুটবলার।

মাঠের নৈপূণ্য দিয়ে সেভাবে আলোচিত হতে না পারলেও, মাঠের বাহিরে আলোচিত হবার মতোই একটি গল্প তৈরি করে চলেছেন রানা। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট 'সুন্দরবন' বেষ্টিত অঞ্চল সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জন্ম তার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের এই অঞ্চলটিতেই কেটেছে তার শৈশব-কৈশোর। সুন্দরবনের সাথে এখানকার মানুষের যতটুকু সখ্যতা, ফুটবলও ঠিক ততটুকুই জনপ্রিয়। গ্রামের মাঠে ফুটবল খেলেই একসময় দিন কাটতো রানার মতো তরুণদের। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নতির ফলে অলিগলিতে সেই ফুটবল যেনো থেমে যায়। ফুটবলপ্রেমী তরুণরাও যেনো ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়ে। তার মধ্যে আবার হিংস্র হায়েনার মতো মাদকের ভয়াল থাবা পড়ে কিছু কিছু তরুণের উপর। এই তরুণদেরকেই মাদকের ভয়ঙ্কর ছোবল আর মাত্রাতিরিক্ত ইন্টারনেট আসক্তি থেকে বাঁচাতেই প্রতিষ্ঠিত হয় ''শ্যামনগর ফুটবল একাডেমী"। মাঠে দারুণ খেলেও যিনি কখনো নায়ক বনে যেতে পারেননি, সেই রানাই এই একাডেমী প্রতিষ্ঠার নায়ক।

এই একাডেমীটাকে বলা হয় ফুটবলার তৈরির কারখানা। একাডেমীর কয়েকজন তরুণ ফুটবলার ইতিমধ্যে বাংলাদেশ অনুর্ধ্ব-১৪ কিংবা অনুর্ধ্ব-১৫ দলের হয়ে দেশে এবং বিদেশে লাল সবুজের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। যার মধ্যে, গত বছর ভারতে অনুষ্ঠিত সাফ অনুর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা রাকিবুল হাসান অন্যতম। এখান থেকে প্রতি বছর ৫০-৬০ জন ফুটবলার বিকেএসপিতে ট্রায়াল দিয়ে থাকে। গত বছর ভারতের সুব্রত কাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বিকেএসপি। টুর্নামেন্টের সেরা ফুটবলার হয়েছিলেন বিকেএসপির হাবিবুর রহমান। হাবিবুরের ফুটবলের হাতেখড়িটা হয়েছিল সেই ফুটবলার তৈরির কারখানাখ্যাত শ্যামনগর ফুটবল একাডেমীতে। শুধুমাত্র পুরুষ ফুটবলারই নয় বরং নারী ফুটবলারদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এই একাডেমী থেকে। তাদের কেউ কেউ প্রতিনিধিত্ব করছেন জাতীয় পর্যায়েও। এই একাডেমী থেকে দীক্ষিত হয়ে বাংলাদেশ অনুর্ধ্ব-১৩ নারী দলে সুযোগ পেয়েছেন রুপা আক্তার। 

এমনিতে আমাদের দেশে প্রচুর ফুটবল প্রতিভা রয়েছে, কিন্তু সেই প্রতিভা বিকশিত করার মতো পর্যাপ্ত একাডেমী নেই। আলমগীর রানা সেক্ষেত্রে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে চলেছেন। নিজে এখনো খেলছেন দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে, সেই সাথে অনেক তরুণ প্রতিভাবানদের এই পর্যায়ে আসার পথ উন্মেচন করে দিচ্ছেন। একাডেমী পরিচালনার ক্ষেত্রে তার সহযোগী হিসেবে রয়েছেন স্থানীয় সংগঠক রোকন উদ্দিন। এই দুজনের অর্থায়নেই নির্মিত হচ্ছে একাডেমী ভবন। এছাড়া, প্রায় ৬০-৭০ জন তরুণ ফটবলারের প্রশিক্ষণের যাবতীয় ব্যয় বহনের দায়িত্বও নিয়েছেন এই দুজন। তবে রানা জানিয়েছেন, একাডেমীতে কোচের সংকট রয়েছে। স্থানীয় কোচ আখতারের অধীনে একসাথে প্রায় অর্ধশতাধিক ফুটবলার প্রতিদিন সকাল-বিকাল দুবেলা অনুশীলন করেন। যদি আরো কয়েকজন মানসম্পন্ন কোচ পাওয়া যেতো তবে একাডেমী থেকে আরো প্রতিভা জাতীয় পর্যায়ে তুলে আনতে পারতেন বলে আত্মবিশ্বাসী রানা। 

রানার একাডেমী পরিচালনার খবর অজানা নয় তার বসুন্ধরা কিংস সতীর্থদের। ড্যানিয়েল কলিন্দ্রেস তো শুনেই অবাক! তবে পরবর্তীতে নিজের একাডেমী পরিচালনার গল্পটাও শোনালেন এই বিশ্বকাপার। রানাকেও অনুপ্রাণিত করলেন। আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার নিকোলাস ডেলমন্টেও উৎসাহিত করেছেন এই মিডফিল্ডারকে। সবচেয় বেশি যে মানুষটা রানাকে প্রেরণা দিয়ে থাকেন, তিনি বসুন্ধরা কিংসের সভাপতি ইমরুল হাসান। নিজের অনুপ্রেরণার উৎসগুলো নিয়ে রানা জানিয়েছেন, "যখন আমার একাডেমীর ছবি এবং ভিডিওগুলো দেখেছিল আমার সতীর্থরা, ওরা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। ড্যানিয়েল (কলিন্দ্রেস) তো জানিয়েছেন তার নিজের একাডেমীর কথাও। নিকোলাস (ডেলমন্টে) ফুটবল নিয়ে কাজ করে যেতে দারুণভাবে উৎসাহিত করেছেন। আমাদের ক্লাব সভাপতি ইমরুল স্যার আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। সংগঠক হিসেবে তিনি সবার নিকট উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।"

বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে মাত্র ৩ ম্যাচ খেলেছেন রানা। কখনো তার নামের পাশে তারকা খ্যাতি যুক্ত হয়নি। কিন্তু নিজ এলাকার মানুষদের কাছে তিনি তারকার চেয়েও বেশি কিছু! মহানুভবতা দিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন মানুষের হৃদয়ে। বাদাম বিক্রেতা থেকে শুরু করে রিকশাচালক কিংবা দিনমজুর, বিপদে পড়লে তাদের দুই নয়ন খুঁজে বেড়ায় রানাকেই। রানাও তাদের আস্থার প্রতিদান দিয়ে থাকেন। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ান এই অসহায় মানুষদের। একবার তার এলাকার এক বাদাম বিক্রেতা দূরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সমাজপতিদের কাছে সাহায্যের হাত বাড়িয়েও ওই ব্যক্তি যখন শূন্যহাতে ফিরেছিলেন, তখন তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন রানা। নিজের অর্থায়নে ওই বাদাম বিক্রেতাকে চিকিৎসার জন্য ভারত যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। যদিও ওই লোকটি আর বেশিদিন বাঁচেন নি। কিন্তু তাতে কি? রানার এমন মহানুভবতার গল্পগুলো তো আর মুছে যাবে না। এমনও হয়েছে যে পাসপোর্ট করতে না পারায়, বিদেশে খেলতে যেতে পারেননি তার এলাকার কোনো এক দরিদ্র ফুটবলার। সেটা শোনার পর, নিজ খরচে ওই ফুটবলারকে পাসপোর্ট করে দিয়েছেন রানা। 

করোনাভাইরাসে কারণে দেশ অঘোষিত লকডাউন হয়ে যাওয়ায় অসহায় হয়ে পড়েছেন খেটে খাওয়া দিনমজুর মানুষগুলো। বিভিন্ন দাতব্য সংস্থাগুলো থেকে তাদেরকে খাদ্য সামগ্রী দেওয়া হচ্ছে। এমনকি, বাংলাদেশ জাতীয় দলের কয়েকজন ফুটবলারও এসময় পাশে দাঁড়িয়েছেন দরিদ্র মানুষদের। রানাও ভাবলেন, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তিনি অসহায়দের সহযোগিতা করবেন। যেই ভাবা, সেই কাজ। তবে তার চোখে দিনমজুরদের চেয়েও বেশি অসহায় প্রতিবন্ধীরা। তাই তিনি সাহায্যের হাত বাড়ালেন প্রতিবন্ধীদের জন্য। এই ফুটবলারের মহানুভবতায় খাবার পেলো কয়েকটি প্রতিবন্ধী পরিবার। পাশাপাশি করোনাভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকতে নিজ এলাকায় মাস্ক এবং সাবানও বিতরণ করেছেন তিনি।

 

বাংলাদেশের ইতিহাসে সেরা খেলোয়াড়দের তালিকায় হয়তো থাকবে না রানার নাম। হয়তো পরিসংখ্যানের অলিতে-গলিতেও তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না সেভাবে। কিন্তু নিজের বলার মতো যে গল্প তিনি তৈরি করে চলেছেন, সেই গল্পই একদিন তাকে পৌঁছে দিবে মানুষের অন্তরে। তার এই গল্প দিয়েই তিনি অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন ভাল কাজে উৎসাহী প্রতিটি মানবের...


ট্যাগঃ

শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা