হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন ডাক্তাররা। তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ব্যাপারে আশা ছিল না কারোরই। অথচ, সেই ডাচ ফুটবলার এখন ধীরে ধীরে পাচ্ছেন সুস্থতার পরশ।

বার্সা মিডফিল্ডার ফ্রেঙ্কি ডি জং নেদারল্যান্ডের একটি টিভি শো-তে কথা বলছিলেন। খবরটা এলো তখনই। প্রায় ২ বছর ৯ মাস পর জ্ঞান ফিরেছে ডাচ বিস্ময়কর তরুণ আব্দেলহাক নুরির। প্রিয় বন্ধুর অবিশ্বাস্যভাবে ফিরে আসার এমন সংবাদ শুনে ডি জংয়ের দুই চোখের কোণে পানি চলে এলো। বহু কষ্টে নিজের কান্না চেপে রেখেছিলেন তিনি। মৃত্যুর কাছাকাছি থেকে নুরি এমনভাবে ফিরে আসায় যারা সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছেন, নিশ্চিতভাবে বলা যেতে পারে ডি জং তাদের একজন। এই ডাচ মিডফিল্ডারের আজকের এই অবস্থানে আসার পেছনে যথেষ্ট অবদান রয়েছে নুরির। 

এইতো, গতবছর চ্যাম্পিয়ন্সলীগে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে ইউরোপের সব জায়ান্ট ক্লাবগুলো যখন ডি জংয়ের প্রতি আগ্রহ দেখানো শুরু করলো, তিনি তখন দ্বিধায় পড়ে গেলেন। প্রিয় বন্ধু নুরি তখন কোমা থেকে ফিরলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। কথা বলতে পারতেন না। তবুও ডি জং ঠিক করলেন, নুরির কাছ থেকে পরামর্শ নিবেন তিনি। যে কথা, সেই কাজ। বাড়িতে নুরির তত্ত্বাবধান করতেন তার মা। একদিন ডি জংয়ের অনুরোধে নুরির মা নুরিকে প্রশ্ন করলেন, 'ফ্রেঙ্কির (ডি জং) কোথায় যাওয়া উচিত?' 'তার কি বার্সাতে যাওয়া উচিত?' চোখ দিয়ে নুরি তখন সম্মতিসূচক ইশারা দিলেন। ঠিক সেই সময়টা ছিল ডি জংয়ের জীবনের একটি স্মরণীয় মুহুর্ত। পরবর্তীতে ঠিকই তিনি আয়াক্স ছেড়ে পাড়ি জমালেন স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনাতে। তার আয়াক্সে যোগ দেওয়ার নৈপথ্যের নায়কও ছিলেন নুরি। তিনি যখন উইলহেম টু ছেড়ে পিএসভি আন্দোহাইভেনে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই নুরি তাকে বললেন, "তুমি আয়াক্সে আসো। সেখানে আমরা সবাই একসাথে খেলবো। পিএসভিতে গিয়ে তুমি কি করবে? আয়াক্সে এসো, প্লিজ।" বন্ধুর অনুরোধেই পরবর্তীতে আয়াক্সে যোগ দিয়েছিলেন ডি জং। এ ক্লাবের হয়েই দ্যুতি ছড়িয়ে তিনি নজর কেড়েছেন ফুটবল বিশ্বের। 

প্রতিভার দিক থেকে নুরি নিজেও ছিলেন অনন্য। তার প্রতিভা সম্পর্কে বলতে গিয়ে একবার আয়াক্স একাডেমীর কোচ উইম জঙ্ক বলেছিলেন, "সে অবিশ্বাস্য খেলোয়াড়।" নিজের মুগ্ধতা প্রকাশ করে নেদারল্যান্ডের সাবেক এই ফুটবলার আরো বলেছিলেন, "আপনি যদি কখনো আয়াক্সের খেলা দেখে থাকেন, দেখবেন সবাই নুরির সম্পর্কে কথা বলছে। কারণ, তার স্কিল অন্য সবার চেয়ে আলাদা। সে খুবই সৃজনশীল, পাশাপাশি দর্শকদের আনন্দও দিতে পারে। যেটা লোকে খুবই পছন্দ করে।" 

নুরিকে স্মরণ করছেন ভক্তরা

মরোক্কান বংশোদ্ভূত নেদারল্যান্ডের এই তরুণকে ধরা হতো সময়ের অন্যতম সেরা প্রতিভাবান হিসেবে। এই প্রতিভা দিয়ে তিনি নিজেকে হয়তো নিয়ে যেতে পারতেন অনন্য পর্যায়ে। কিন্তু ২০১৭ সালের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা তাকে ছিটকে দেয় ফুটবল মাঠ থেকে। জার্মান ক্লাব ওয়েডার ব্রেমেনের বিপক্ষে প্রাক-মৌসুমে প্রীতি ম্যাচ খেলতে যায় আয়াক্স। ম্যাচের আগেই নুরি তার পাকস্থলির ব্যথা ও ভাল ঘুম না হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তবুও হাফটাইমের পর হাকিম জিয়েখের বদলী হিসেবে তাকে নামানো হয় মাঠে। ম্যাচের ৭২ মিনিটের দিকে ধীরে ধীরে কমে আসে তার গতি। হঠাতই তিনি লুটিয়ে পড়েন মাঠে। খারাপ কিছু হতে যাচ্ছে বুঝতে পেরে সাথে সাথে মাঠে মেডিকেল টিমকে ডাকেন রেফারি। কিন্তু সেখানকার প্রাথমিক চিকিৎসাতেও নুরি সেরে ওঠেন নি। কারণ, তার কার্ডিয়াক অ্যারিদমিয়া অ্যাটাক হয়েছিল। যার ফলে তার মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি হয় এবং তাকে চলে যেতে হয় কোমাতে।

সেই সময়, পুরো নেদারল্যান্ডবাসী যেনো এক নুরির সুস্থতা কামণায় ব্রতী হয়েছিল। কতশত আয়োজন করেছিল তার ভক্ত-সমর্থকরা! একটু দেরী হয়েছে বটে, কিন্তু সবার প্রার্থনাগুলো বৃথা যায় নি। ১০-১২ ঘন্টা কিংবা একদিন নয়, প্রায় এক বছর পর কোমা থেকে ফিরেছিলেন নুরি। ২০১৮ সালে নুরি যখন কোমা থেকে বাসায় ফিরেছিলেন, তখন ডাক্তাররাও তার সুস্থতার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। কেউ হয়তো ভাবেইনি যে, কখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন তিনি। কিন্তু, তার পরিবারের পরিচর্যার কারণে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থতার পরশ পাচ্ছেন। 

তার ভাই আব্দের রহিম জানিয়েছেন, প্রায় ২ বছর ৯ মাস পর তিনি কথা বলতে পারছেন। পরিবারের অনেককেই চিনতে পারছেন। ধীরে ধীরে হয়তো স্বাভাবিক জীবনেও ফিরতে পারবেন তিনি। 

মাঠের খেলায় হয়তো আর কখনোই দেখা যাবে না নুরিকে, কিন্তু একটু একটু করে হলেও তিনি এগুচ্ছেন জীবনের খেলায়। হয়তো তার পরিবার, ভক্ত-সমর্থক আর অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রার্থনায় খুব শ্রীঘ্রই তিনি ফিরবেন তার স্বাভাবিক জীবনে।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা